‘আমার মাকে কি আমি বাঁচাতে পারব না? আমার মা মাহমুদা খাতুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে নয়, আছেন পিসিসিইউতে। তার অক্সিজেন সেচুরেশন ৬৫ থেকে ৭০-এ ওঠানামা করছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, এখনই আইসিইউতে না নিলে আমার মাকে বাঁচানো যাবে না। অনেক চেষ্টা করেও তাঁর জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করতে পারিনি। আমার মা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন, শ্বাস নিতে পারছেন না। আমার জীবনের বিনিময়ে কেউ কি আমার মাকে একটি আইসিইউ বেড দিতে পারেন?’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে দেয়ালে এটুকু লিখেছিলেন কবি মোহন রায়হান। তার এই আকুতি, ফেসবুকের নিউজ ফিডে যখন ভেসে আসে, পাঠের পর স্বাভাবিকভাবেই দুমড়ে-মুচড়ে উঠতে থাকে মন। চোখ ভিজে যেতে যেতে আমাদের অসহায়ত্ব, আমাদের সীমাবদ্ধতায় দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। নিজেকে সামাল দিতেই দ্রুত স্ক্রল করে ভেসে আসা বার্তাগুলোকে জোর করে সরিয়ে দিলেও, মন তো সরিয়ে দিতে পারে না। মনের মধ্যে তার দাপাদাপি তার অস্থিরতা চলতেই থাকে। পরিচিত অনেকেই বার্তাটি শেয়ার করেছেন, যেন এমন কারো নজরে পড়ে, যিনি হাসপাতালে একটি আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা রাখেন। কবির মায়ের জন্য আইসিইউ বেড জোগাড় হয়। কিন্তু তখন তিনি সেই প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। সে খবর জানিয়ে পরদিন কবি নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবার লেখেন, ‘...একটা আইসিইউর জন্য আমি যখন একবার ইনচার্জের রুম, আরেকবার পরিচালকের রুমে দৌড়ে ছুটে বেড়িয়েছি, মায়ের সেই করুণ আকুতির বস্ফািরিত চোখ ছাড়া আমার সামনে আর কোনো দৃশ্য ছিল না। অবশেষে জনমদুখিনী সেই মাকে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছি, কিন্তু হূদস্পন্দনহীন নীরব নিথর চির ঘুমের নিস্তব্ধতায়। তাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে এসেছি, কিন্তু আমার চোখের সামনে স্থির হয়ে আছে সেই দৃশ্য, যেখান থেকে আমার আর বেরোনোর উপায় নেই।... হাসপাতালের আইসিইউ বঞ্চিত মা আমার, কবরের চিরশান্তির আইসিইউতে ঘুমিয়ে এখন।’
২. বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে পরিচয়ে খ্যাত অভিনেত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য কবরী সারওয়ারের জন্য আইসিইউ না পাওয়ার কথা জানা যায় একটি দৈনিকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি বরেণ্য এই অভিনেত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেন। রাতে পরামর্শ দিলেও সকাল পর্যন্ত তার জন্য আইসিইউ খুঁজে পাওয়া যায় না। খবর প্রকাশের পর এবং নানামুখী চেষ্টায় দুপুুরের দিকে, বরেণ্য এই অভিনেত্রীর জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা হয়। প্রায় তেরো দিন হাসপাতালে থাকার পর তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নেন।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজশাহীর বাসিন্দা শিরীন জাহান তার করোনায় অক্রান্ত প্রিয়তম স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে বিড়ম্বনা বিষয়ে নিজের দেয়ালে লেখেন, ‘হাসপাতালে একটুও জায়গা পাওয়া গেলো না লাশটাকে ধোয়ানোর জন্যে। এবং বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, আমরা ট্রলিটা দোতলা থেকে লিফটের মাধ্যমে নীচে নিয়ে এসে লম্বা বারান্দাপথে এগিয়ে অপেক্ষমাণ গাড়িতে ওঠাবো, সেই সুযোগটা পেতে আশ্চর্যজনকভাবে বার বার বাধাগ্রস্ত হতে লাগলাম। মনে হচ্ছে, ট্রলিটি যেন করোনা জীবাণু স্প্রে করতে করতে চলছে, তাই লোকজন হৈচৈ চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে? হাজার বলেও তাদেরকে থামানো বা বোঝানো যাচ্ছে না। কয়েকবার এদিক-ওদিক করে বেড়াতে হয়েছে।’ এরপর তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘বুঝতে কি পারছেন কি ভয়ানক বিপর্যস্ত অবস্থা আক্রান্তের এবং শোকাহত পরিবারটির? এটা কতটা অমানবিক, ভেবে বলুন তো?’ বিভাগীয় শহর রাজশাহীর সবচেয়ে বড় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে কিন্তু তিনি প্রশ্ন তোলেননি, বরং তিনি দেখিয়েছিলেন, মৃতের শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই কতটা অমানবিক ও বেদনাদায়ক অবস্থা তাকে পার করতে হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া রোগীর স্বজনরা অন্য রোগীর স্বজনদের প্রতি কতটা নির্মম আচরণ করতে পারে।
এরপর তিনি খুব জরুরি একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। করোনা রোগীর মৃতদেহ নিয়ে যেন পরে আর কারো এরকম অবস্থার মুখোমুখি হতে না হয়, সেজন্য তিনি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর নিজস্ব এরিয়াতেই একটা ঘর বা একটু খোলা জায়গা রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। সেখানে মৃতের শেষ গোসল করিয়ে স্বজনরা তাহলে নিশ্চিন্তে মৃতব্যক্তিকে নিয়ে যেতে পারবে। এতে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির শেষ যাত্রায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে পারবে। শিরীন জাহান লিখেছেন, ‘আমাদের সকলেরই উচিত, সকলকে বোঝানো, মৃত মানুষ বিশেষত কোভিড-১৯ লাশ থেকে রোগ ছড়ায় না। ছড়ায় সান্নিধ্যে আসা অসচেতন লোকজন দ্বারা।’
৪. বর্তমান অবস্থা বোঝার জন্য উপরের তিনটি বর্ণনাই যথেষ্ট। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে আইসিইউর। সংকটাপন্ন রোগীর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইসিইউ বেড। অথচ হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত এ বেডের সংকট। চারদিকে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বলছে, আইসিইউ নিয়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। একটি আইসিইউ বেডের জন্য রোগীর স্বজনরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। অভিনেত্রী এবং সাবেক সংসদ সদস্য কবরী সারওয়ার এবং কবি মোহন রায়হানকে তার মায়ের জন্য আইসিইউ বেড খুঁজতে যে গলদঘর্ম হতে হয়েছে, তাতে সাধারণের অবস্থা ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ আমাদের প্রস্তুতির কমতি ছিল না। পরিকল্পনারও কমতি ছিল না। প্রথম দফা করোনার ঢেউ যে ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে বলে শঙ্কা ছিল, আশার কথা পরিস্থিতি সেখানে যায়নি। সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। সেই নিয়ন্ত্রণই কি কর্তাব্যক্তিদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে? যাতে দ্বিতীয় দফায় করোনা আমাদের নাকাল করে ছাড়ছে? গত কয়েকদিন থেকে প্রতিদিনই শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে। মৃতের সংখ্যা পেরিয়েছে দশ হাজারের ফলকও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা রোগীদের মাত্র দশ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন। বাকিদের বড় অংশকে শুধু হাই ফ্লো অক্সিজেনের মাধ্যমেই সুস্থ করা সম্ভব। অথচ আমাদের হাসপাতালগুলোতে হাই ফ্লো অক্সিজেন দেবার ব্যবস্থাও নেই। যদিও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বলছে, পরামর্শক কমিটি কয়েক দফা প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু হাই ফ্লো অক্সিজেনের বিষয়টি আমলেই নেওয়া হয়নি। আমাদের সামনে সুযোগ ছিল, প্রথম দফা করোনার ঢেউয়ের পরেই, যেসব জায়গায় ঘাটতি ছিল, তা পূরণের। কিন্তু তা হয়নি। করোনা মোকাবিলায় সরকারপ্রধান যে আন্তরিকতায় এগিয়ে এসেছেন, তিনি যেভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পরিকল্পিত নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই নির্দেশনা যারা পালন করবেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার কতটুকু মূল্য দিয়েছেন, তা হয়তো বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে। আমরা প্রায় এক বছর সময় পেয়েছি, সরকারের তরফ থেকে অর্থ বরাদ্দেও কমতি ছিল না। তারপরও কেন এই অবস্থা?
করোনাকালীন এই সময়ে চিকিৎসক, নার্সের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের গুরুত্বও অনুভূত হচ্ছে। করোনা মহামারী থামাতে সবচেয়ে জরুরি নমুনা পরীক্ষা। যার মাধ্যমে শনাক্ত হবে রোগী, আর তাদের দ্রুত আলাদা করার মাধ্যমে কমে আসবে সংক্রমণের হার। শনাক্তের কাজটি করেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। আমাদের দেড় লাখ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের চাহিদার বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ছয় হাজারের মতো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, সংখ্যাটি সংবাদপত্রেই প্রকাশিত। নানান জটিলতায় গত দশ বছর এ পদে নিয়োগ হয়নি। করোনার প্রথম দফা ঢেউয়ের সময়ে পদটির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের শূন্য পদ পূরণের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। আবেদনকারীদের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষাও নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু এখনো ফল প্রকাশ হয়নি, নিয়োগ পায়নি কেউ। নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার পেছনে রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। রয়েছে অসচ্ছতার অভিযোগও। যা উঠে এসেছে সংবাদপত্রে।
করোনাকালের এই মহামারীতেও এ ধরনের অভিযোগের খবর পাঠ করা বেদনার। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী যেখানে এক বছর আগেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত কার বা কাদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতায় থমকে গেছে, আমরা সে প্রশ্নটি রাখতে চাই। কার বা কাদের সাহস হয় এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করার? করোনা মহামারী সামাল দেওয়ার পাশাপাশি এই প্রশ্নগুলোরও সমাধান হওয়া জরুরি। অন্যথায় যে দুষ্টচক্র জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাধা তৈরি করছে, তারা যে একদিন বিষবৃক্ষ হয়ে আরো বড় বিপদের ক্ষেত্র তৈরি করবে না, তা কে বলতে পারে? আইসিইউ বেড নিয়ে হাহাকারের মধ্যে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলো বলছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩০টিরও বেশি জেলায় সরকারি পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা নেই। আবার কোথাও কোথাও আইসিইউ বেড থাকলেও তা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নেই। এই যে সংকট, এর পেছনেই-বা কোন প্রশ্নটি লুকিয়ে রয়েছে? সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
৫. করোনার প্রথম দফার সঙ্গে কিছু কিছু বিষয়ে দ্বিতীয় দফায় এসেও অবস্থার যে খুুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে, তা নয়। প্রথম দফায় আমাদের ভয় ছিল, সেই ভয় কেটেছে, আমাদের সাহস বেড়েছে। কিন্তু মানবিকতার যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল, তা কাটেনি। প্রথম দফায় কারো করোনা শনাক্ত হলে, তার বাড়ি লকডাউন করে দেওয়া, সামাজিকভাবে হয়রানি করা, বাড়িতে ঢিল ছোড়া, বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়া, অসুস্থকে রাস্তায় ফেলে রাখার মতো অমানবিক অনেক ঘটনা ঘটে। আবার অন্যদিকে মৃত ব্যক্তির জানাজা, তাকে কবরস্থ করা বা মৃত ব্যক্তিকে তার নিজ ধর্মানুযায়ী সৎকারের জন্য আত্মীয় পরিজন এগিয়ে না এলেও অপরিচিত স্বেচ্ছাসেবী এগিয়ে এসেছেন। সে সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনেক আশাব্যবঞ্জক উদাহরণও রয়েছে। এবার যেহেতু আমাদের ভয় কেটেছে, আমরা বীরদর্পে লকডাউন, বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বাইরে আসছি, ইচ্ছেমতো ঘুরছি-ফিরছি, আমাদের সাহস দেখাচ্ছি, শঙ্কাটা এখানেই। এত সাহসের পরেও কেন করোনায় মৃত ব্যক্তির মৃতদেহ নিয়ে স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে? মৃতদেহ থেকে যে করোনা ছড়ায় না, এ তো প্রমাণিত সত্য। এত সাহস নিয়েও তাহলে কেন আমাদের ভয়, শঙ্কা সব চাপিয়ে দিচ্ছি মৃতের স্বজনদের ওপর? সেই সঙ্গে আমরা হয়তো এটাও ভুলে যাচ্ছি, অকারণে সাহস দেখাতে যাওয়ার বিপদ কতটা। ভুক্তভোগী ছাড়া এ আর কেইবা জানবেন? যেভাবে প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে বেঁচে থাকার আকুলতা, তাতে করে এখন সাহস দেখানোর চেয়ে সচেতনতা-বাড়তি সতর্কতাই জরুরি। তাই আসুন আমরা সেই অনুশীলন করি।
লেখক : কবি, সাংবাদিক





