মুক্তমত

কতটুকু মূল্যায়ন হচ্ছে বাংলা ভাষার

  • প্রকাশিত ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

খায়রুজ্জামান খান

 

 

১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত করে যায়। একদিকে পাকিস্তান অপরদিকে ভারত। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর পাকিস্তানের আবার দু’ভাগ হয়— পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল বেশি এবং তাদের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম এবং তাদের ভাষা ছিল উর্দু। বাঙালি প্রথম বৈষম্য ও শোষণের শিকার হয় ভাষা নিয়ে। তৎকালীন পাকিস্তানের  কর্ণধাররা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় বাংলা ভাষাকে। অথচ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর ভাষাগত জনসংখ্যা একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মোট জনসংখ্যার ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় এবং ৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ উর্দু ভাষায় কথা বলে। উর্দু ছিল পাকিস্তানি ভাষাভাষীর দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ৯৮ শতাংশ মানুষ ছিল বাংলাভাষী। তা সত্ত্বেও বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরা পরিকল্পনা করে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার আগে ঘোষণা করেন যে, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ তার কথার উত্তরে ঘটনাস্থলেই দুজন ছাত্র বলেছিলেন, ‘না, না, না।’ তার এই কথার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ রুখে দাঁড়ায়। তারা মাতৃভাষার স্বাধীনতা চায়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মাতৃভাষার স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই করেন। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মাতৃভাষার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের ডাক দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় মিছিল বের করে। তাদের সঙ্গে সাধারণ জনগণও যোগ দেয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এই মাতৃভাষা আন্দোলনের মিছিলে শাসকগোষ্ঠী গুলি ছুঁড়ে এবং বহু ছাত্র হতাহত হয়। এতে মারা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, ও সালামের মতো আরো অনেকে। ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল। স্মরণীয় হয়ে থাকবে দেশটির জাতির কথা যে জাতি মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভ করে বীর বাঙালি। পৃথিবীর মানচিত্রে লাল-সবুজে খচিত নতুন সূর্য উদিত হলো— ‘বাংলাদেশ’ এবং বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেল।

কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর সুবর্ণজয়ন্তীতে পা রাখলেও চারদিকে দেখা যাচ্ছে মাতৃভাষার টান যেন কমে গেছে। মাতৃভাষার মূল্যায়ন যেন কমে গেছে। কতটুকু মূল্যায়ন হচ্ছে বাংলা ভাষার? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের রেডিও অফিসের মূল ভবনের নামকরণ করা হয়- বাংলাদেশ বেতার। কিন্তু ১৯৭৬ সালে নাম পাল্টে আবারো নামকরণ করা হয়- রেডিও বাংলাদেশ। রেডিও যা বিদেশি শব্দ। এরপর কিছু কিছু সরকারি ভবনেরও নাম পরিবর্তন করে ইংরেজিতে নামকরণ করা হয়।

“ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’/কথায়-কথায় হাসে না/জানেন দাদা, আমার ছেলের,/বাংলাটা ঠিক আসে না। বলছিলাম কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের লেখা কবিতার কথা। আজ যেন তার কবিতার প্রতিটি কথা মিলে যাচ্ছে আমাদের বর্তমান সময়ের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তারা বাংলার থেকে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছে। প্রাথমিক শিক্ষায় বর্তমানে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব যতটা দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাভাষার গুরুত্ব অধিকতর কমে গেছে। তারা বাংলা ভাষার চেয়ে অন্য ভাষার প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েছে। অন্য ভাষার প্রতি যখন আকৃষ্ট হচ্ছে তখন অন্যদেশের সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজস্ব মাতৃভাষার সঙ্গে নিজস্ব সংস্কৃতি। মাতৃভাষার প্রতি টান কমে গেছে। আমরা যেন অন্যভাষায় কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মাতৃভাষা হলো সবার ঊর্ধ্বে, এই কথাটি সকল স্তরের জনগণকে বুঝিয়ে দিতে হবে। বাংলা ভাষা হোক সর্বজনীন মাতৃভাষা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ফেব্রুয়ারি মাস এলে যে শুধু ভাষার প্রতি এবং ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব এমন যেন না হয়।

আজ সুবর্ণজয়ন্তীতে  আমরা পদার্পণ করেছি। কিন্তু ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা কমে গেছে অনেকাংশে। কমে গেছে বাংলা ভাষার চর্চা। এখনো প্রতিটি সরকারি ভবনে দেখা যায় ইংরেজিতে নামকরণ করা। কোর্টে এখনো বিচারকার্য পরিচালনা করা হয় ইংরেজিতে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজি করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পেও দেখা যাচ্ছে ইংরেজিতে নামকরণ। যার ফলে বাংলা ভাষার চেয়ে অন্য ভাষার চর্চার লক্ষ করা যাচ্ছে অধিক। বাংলা ভাষা চর্চার প্রতি আমাদের গুরুত্ব বেশি দিতে হবে। এর জন্য সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রসার ঘটাতে হবে। চাকরির পরীক্ষায় বাংলা থেকে ইংরেজির গুরুত্ব বেশি দেওয়া হচ্ছে। সকল পড়ালেখার মাধ্যম ইংরেজি করা হচ্ছে। দোকানের নাম, রাস্তার মোড়ে, পরিবহনে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে লেখা হচ্ছে। বেতারগুলো দেখা যাচ্ছে ইংরেজিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। অন্য দেশের ভাষা শিখতে চাইলেও নিজ দেশের মাতৃভাষাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। এ বিষয়টি সবার গুরুত্বের সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে। সর্বোপরি বাংলা ভাষা হোক প্রাণের ভাষা। বাংলা হোক সর্বজনীন ভাষা।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads