ভাস্কর আইভি জামান
আমি একজন বিপ্লবী শিল্পীর সম্বন্ধে স্মৃতিচারণ করতে চাই, তিনিই শিল্পী ইমদাদ হোসেন। আজ ফেব্রুয়ারির মাসের প্রথমেই তাঁর কথাই মনে আসছে। শিল্পী ইমদাদ হোসেন ছিলেন গণমানুষের জন্য কাজ করা মধ্যবিত্ত পরিবারের বিপ্লবী সন্তান। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতির মননশীল চিন্তাকে তিনি নিয়ত লালন ও পরিচর্যা করেছেন। তাই ভাষা আন্দোলনে ছায়ানট প্রতিষ্ঠায় , রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মেলনে বৈশাখি মেলা, পৌষ মেলা, নবান্ন, মঙ্গল শোভাযাত্রা ইত্যাদি তাবৎ বাঙালি সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতাদের সারিতে। সামপ্রদায়িকতা ও শ্রেণিবিভেদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক আপোসহীন ও লড়াকু সৈনিক। দাঙ্গার সময় নিজের বন্দুক কাঁধে নিজস্ব এক যুবক বাহিনী নিয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন, তাই অভিহিত হতেন ‘আনসার কমান্ডার’ নামে। লোকশিল্পের উন্নয়ন ও নানান সমাজ গঠনমূলক কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন সারা জীবন। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে শুরু করে বিসিক নকশাকেন্দ,ক্রিসেন্ট গ্রুপ, কালার স্ক্যান ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন ব্যস্ত কর্মযজ্ঞে। শুধু চিত্রশিল্পী বা নকশাবিদ নন,তিনি ছিলেন নির্ভীক ভাষাসংগ্রামী এবং একজন সফল সংগঠক ও একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। ১ম ব্যাচের সহপাঠী শিল্পী আমিনুল ইসলাম ইমদাদ হোসেন সম্পর্কে শুরু করেছেন এভাবে ‘একদিন ক্লাশে যোগ দিল বেশ লম্বামতো সুদর্শন আলোকিত চেহারার একজন ছাত্র নাম ইমদাদ হোসেন।
কিছুদিনের মধ্যেই ইমদাদ হোসেন তাঁর ক্লাসের অনেকেরই সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন তাঁর সরল হাসি আর ভয়ানক বাঙ্গালিয়ানা চেতনার জন্য। তখন ইমদাদ হোসেন বাড়ির আশেপাশের গ্রামগুলোতে চুরি-ডাকাতি বেড়ে গেল। তখন ইমদাদ হোসেন গড়ে তুললেন আনসার বাহিনী। এটি এখনকার আনসার বাহিনী নয়, ছিল স্বেচ্ছায় গ্রামবাসীদের উপকার করতে আসা যুবকদের একটি সংগঠন। ইমদাদ হোসেন হলেন আনসার বাহিনীর কমান্ডার।
ইমদাদ হোসেনের বীরত্বগাঁথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের উচ্চ মহলে খবর পৌঁছে যায়। সেই সময়ের আনসার সর্বাধিনায়ক নিজে এসে ইমদাদ হোসেনকে পুরস্কৃত করেন।
ইমদাদ হোসেন এবার সহপাঠী হিসেবে পেলেন মুর্তজা বশীর,আব্দুর রাজ্জাক, কাইয়ুম চৌধুরী, রশীদ চৌধুরী প্রমুকে। ১৯৫৪ সালে আর্ট ইনস্টিটিউটের কমার্শিয়াল বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেন শিল্পী ইমদাদ হোসেন।
পটুয়া কামরুল হাসান ইমদাদ হোসেনকে নিয়ে একটি কমার্শিয়াল ফার্ম গড়ে তুললেন। নাম দেওয়া হলো VIBGYOR.
(ঢাকা টেলিভিশন ১৯৬৪-তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল) শিল্পী ইমদাদ হোসেন চিফ ডিজাইনার হিসেবে শুরু করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার চাকরির সময়কাল ১০ বছর। চিফ ভিজাইনার হিসেবে তার সময়কাল শেষ করেন।
পটুয়া কামরুল হাসানের অনুরোধে ১৯৭৬ সালে দ্বিতীয়বার চিফ ডিজাইনার হিসাবে ডিজাইন সেন্টারে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে অবসরের আগে পর্যন্ত ওখানেই কর্মরত ছিলেন।
গণঅআন্দোনের বিভিন্ন কমিটিতে ইমদাদ ভাই থাকতেন। সমস্ত শিল্পীদের একত্রিত করতেন, কাজ নির্ধারণ করতেন, এমনকি ফেস্টুনের ভাষাও ঠিক করে দিতেন। ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠান, বৈশাখী মেলা-এ সবকিছু কীভাবে আয়োজন করা যায় তার একটা সাংগঠনিক রুপ তিনি দিয়েছিলেন, সেখানে ওয়াহিদুল ভাই, সানজীদা আপা, বিসিক সম্পৃক্ত ছিল। মঙ্গল শোভাযাত্রার আগে রফিকুন নবী, কামাল লোহানী মুশতফা মনোয়ার চারুকলার শিক্ষক ও আরো বিশিষ্টজনদের সাথে চারুকলার কক্ষে বসে যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করে নিতেন। চিত্রশিল্পীদের বিভিন্ন সমস্যা বিশেষত তাদের চাকরির ও পেশাগত মান ও মর্যাদারকে উন্নত করা ,সরকারি স্কুল - কলেজগুলোতে কীভাবে শিল্পীরা অংশ নিতে, পারে তা নিয়ে ইমদাদ হোসেন সারাক্ষণ চিন্তা করতেন। শুধু শিল্পীসমাজ নয়, তিনি গণমানুষের কথা ভাবতেন।
চিত্রশিল্পী ইমদাদ হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বকুল তাঁদের ঘরে আলোকিত মানুষ জন্মগ্রহণের করেছেন সাতটি সন্তান তৃতীয় সন্তান নিসার হোসেন ছোটন। আমাদের প্রাণের চারুকলা অনুষদের ডিন নির্বাচিত হয়েছেন পর পর চতুর্থ বার । একই পরিবারের তিন ছেলে ও নাতনি শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, আমরা আনন্দিত ও গর্বিত সার্থক হোক যাত্রা।





