ফিচার

অসহায়দের তরে রিফাদের ছুটে চলা

  • অরণ্য সৌরভ
  • প্রকাশিত ২৯ নভেম্বর, ২০২১

আর্থিক প্রতিবন্ধকতার ভেতর লড়াই করে কেটেছে ছেলেবেলা। নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে সবেমাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। অর্থকষ্ট থাকায় ৩ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতেন অধিকাংশ সময়। কখনো কখনো ১০ টাকা নিয়ে স্কুলে গেলে ভাবতেন ৫ টাকা বাসায় ফেরত নিয়ে যেতে হবে। যেন পরের দিন স্কুলে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অর্থকষ্টের ভেতর দিয়ে যখন দিনাতিপাত করছেন তখন থেকেই শপথ নিয়েছিলেন কখনো সামর্থ্যবান ও সুযোগ হলে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ প্রদান করবেন। তার বাবাকে এমন ভাবনার কথা জানালে, তিনি বলেন, চাকরি ফিরে পেলে ছেলের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাথে থাকবেন। সেই থেকেই মানুষের তরে তার কাজ করা শুরু। তার বাবা চাকরিতে বহাল হওয়ার পরে শুরু করেন বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম। নিজের পকেট খরচ ও টিফিনের টাকা থেকে ভালো কাজ করার চেষ্টা করতে থাকেন তিনি। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ, নতুন জামা উপহার, খাদ্য সহায়তাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন নিজ উদ্যোগে।

যার গল্প বলছি তিনি শেখ রিফাদ মাহমুদ। নাটোরের সিংড়ার বাহাদুরপুর গ্রামের সন্তান হলেও বেড়ে উঠেছে নাটোর শহরের কানাইখালীতে। ২০১৯ সালে নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাসের পর রাজশাহী পলিটেকনিকের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নরত।

২০১৭ সালে নাটোর লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘের সাথে সভাপতি হিসেবে যুক্ত হন তিনি। যুক্ত করলেন বন্ধু নাহিদ আহমেদ ও আকাশ আলমগীরকে। চলতে থাকলো বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম। ধীরে ধীরে তাদের সাথে প্রায় ৫০ জন সদস্য যুক্ত হয়ে গেলেন। ২০১৯ সালের শেষার্ধে উপজেলা ভিত্তিক কমিটি করার উদ্যোগ নেন তিনি। নাটোর সদর, গুরুদাসপুর, সিংড়া, নলডাঙ্গা উপজেলায় লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘের কমিটি গঠন করেন। তখন সব মিলিয়ে জেলাব্যাপী প্রায় ৩০০ সদস্য তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, নতুন জামা উপহার, পথচারীদের গাছ উপহার সহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালনা করেন। করোনাকালীন সময়ে জেলাব্যাপী সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, নাটোর শহরের রিকশা ও ভ্যানচালকের মধ্যে চাল, ডাল, আলু বিতরণ বিতরণ করেন। এছাড়া মাদক, বাল্যবিয়ে, ইভটিজিং, যৌতুকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করেন থাকেন তিনি। কেউ বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে এমন খবর পেলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন বলেও জানান তিনি। বর্তমানে সংগঠনের কার্যক্রম দেশব্যাপী পরিচালিত হচ্ছে।

করোনাকালীন প্রায় ৬ শতাধিক মানুষের মাঝে নিজ উদ্যোগে খাদ্য সহায়তা প্রদান করেন। পাশাপাশি করোনাকালীন ঈদুল ফিতরে প্রায় ৪ শতাধিক পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান, বন্যায় কর্মহীন শতাধিক পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান করেন।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, নতুন জামা উপহার, শিশুশ্রম বন্ধে বাবা-মাকে সচেতন করা, শিশুশ্রমের ভয়াবহতা, স্বাস্থ্যের ক্ষতি সম্পর্কে অবগত করা, মাদক-বাল্যবিবাহ ও মন্দ পথ ইত্যাদির বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করছেন তিনি। তিনি মনে করেন, শিশুশ্রম বন্ধে পরিবারকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য ‘শেখ রকিবুল ইসলাম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ নামে দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। এছাড়া জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষ রোপণ এবং বিতরণ করেন। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ রোধে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেন তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রিফাদ বলেন, টেকসই কিছু কাজ করতে চাই। যার মধ্যে এতিমখানা প্রতিষ্ঠা, সুবিধাবঞ্চিত ও পথ শিশুদের থাকা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, অসহায় পরিবারের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। বাল্যবিবাহ, ইভটিজিংমুক্ত নিরাপদ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে চাই। এছাড়া শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও সাইবার অপরাধ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে চাই।

এবছর শিশুদের নোবেলখ্যাত আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তিনি। এছাড়া এ বছর নেপাল সরকার ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংস্থার সহযোগিতায় ইয়ুথ পার্লামেন্টের উদ্যোগে নেপালে অনুষ্ঠিত যুব সম্মেলনে ‘বিশ্ব যুব নেতা’র সম্মাননা রয়েছে তার সাফল্যের ঝুড়িতে।

এ ব্যাপারে রিফাদ বলেন, সম্মাননা বা পুরস্কার সব সময়ই আনন্দের। সম্মাননা পেয়ে নিজের ভেতরে ভালো লাগা ও উৎফুল্লতা কাজ করছে। যা আমার সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads