বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৩ July ২০২৪

চোরাই মোবাইলের স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার


নিজস্ব প্রতিবেদক:

ভারতে চুরি যাওয়া মোবাইলফোন দেশের অভ্যন্তরেই হাতবদল হয়। বাংলাদেশি চোরাকারবারিরা দেশটির আবাসিক হোটেলে অবস্থান করে সংগ্রহ করেন এসব ফোন। এরপর সময় সুযোগমতো ফলবাহী ট্রাকে আবার কোনো সময় অসাধু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বাংলাদেশে ঢুকান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আসে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে। এই বাজারেই হয় চোরাই মোবাইলের রমরমা ব্যবসা। কারবারিদের প্রধান টার্গেট আইফোন। এ মডেলের একেকটি ফোনে কারবারিরা ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করেন।

জানা গেছে, ভারতে হারিয়ে যাওয়া একটি চোরাই মোবাইল মাসখানেক আগে উদ্ধার হয় চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে। এর আগে রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে কেনা আইফোন নিয়ে ভারতে গিয়ে দেশটির পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন শাহ আলম নামে একজন। রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে কম দামে তিনি আইফোনটি কিনেছিলেন। দেশে মোবাইলটি নিরাপদে ব্যবহার করছিলেন তিনি। পরবর্তীতে চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি ভারতের মুম্বাই শহরে যান। সঙ্গে মোবাইলটিও নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন। কারণ, তার হাতে যে মোবাইলটি ছিল সেটি ভারত থেকেই চুরি গিয়েছিল।

গত ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একাধিক লোকজন চোরাই মোবাইল নিয়ে ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। এতে করে একদিকে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তাই এসব ব্যবসা বন্ধে অনতিবিলম্বে রিয়াজউদ্দিন বাজারে বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন খোদ ব্যবসায়ীরাই।

দেশে এসব অবৈধ মোবাইল বিক্রির জন্য রিয়াজউদ্দিন বাজারে মোহাম্মদীয়া প্লাজায় 'মিশমা টেলিকম' নামে একটি দোকান দেন রাশেদ। ওই দোকানে বসেন রাশেদের ভাই কায়সার। সেখান থেকে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন দোকানে এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলার দোকানগুলোতে চোরাই মোবাইল সাপ্লাই দেওয়া হয়। আবার, একই দোকানে সংগ্রহ করা হয় বাংলাদেশে চুরি যাওয়া এবং ছিনতাই হওয়া মোবাইল। এসব মোবাইল কায়সার নিয়ে যান দুবাই। সেখান থেকে মোবাইলগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে যায়

কেন চোরাই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা? সাধারণ একটি নতুন ফোনে দোকানিরা এক থেকে দুই হাজার টাকা লাভ করতে পারেন। তবে চোরাই মোবাইল হলে একেকটিতে তারা ২৫ থেকে ৩৫ এমনকি ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করেন। এ কারণে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা চোরাই মোবাইল বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন।

রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী জানান, একটি আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স মডেলের মোবাইলের বর্তমান বাজারদর দেড় লাখ টাকা। ভারতের চোরাকারবারিরা এটি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করেন। এ ধরনের একেকটি মোবাইল বর্ডার ক্রস করতে খরচ হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এরপর এসব মোবাইল দোকানে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করেন বিক্রেতারা।

অন্যদিকে ক্রেতারাও প্রচলিত বাজারমূল্যের প্রায় অর্ধেক মূল্যে ফোন পেয়ে সন্তুষ্ট হন। সম্প্রতি ভারতীয় চোরাই মোবাইল উদ্ধারের ঘটনা জানাজানি হওয়ায় আতঙ্কে আছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

চোরাচালানের গডফাদার রাশেদ-রুবেলরা অধরা:
রিয়াজউদ্দিন বাজারে চোরাই মোবাইল ব্যবসার অন্যতম মূল হোতা মো. রাশেদ। এই বাজারে তার মতো অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন এই চোরাই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে হেলাল, তারেক ও রুবেলসহ কয়েকজনের নাম জানা গেছে।

তাদের মধ্যে রাশেদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছিলেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা এই যুবক। সেখানে ভাগ্য উন্নত না হওয়ায় কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে আসেন তিনি। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে চাকরি নেন একটি দোকানে। বিক্রয়কর্মী হিসেবে তেমন সুবিধা করতে না পারলেও চাকরিকালীন সময়ে তার সঙ্গে চোরাচালানে জড়িত লোকজনের সখ্য গড়ে ওঠে।

রাশেদের মোবাইল চোরাচালানে জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসে গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ভারত থেকে দেশে ফেরার সময় রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার ব্যাগ তল্লাশি করে ২২টি দামি মোবাইল, চার লিটার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, ১৭ পিস শাড়ি, ১৭ পিস থ্রিপিস এবং ৪০ পিস টি-শার্ট জব্দ করা হয়। ওই দিন তার সঙ্গে ছিল (B00311540) নম্বরের পাসপোর্ট। ঘটনার সময় তিনি প্রথমে কাস্টমস কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যান। এরপর মাঠে এসে আর্মড পুলিশের হাতে আটক হন। তার ব্যাগে সন্দেহজনক মালামাল থাকায় তাকে পুনরায় কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর মালামালগুলো জব্দ করেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন চন্দ্র ভৌমিক। তিনি নিজে সই করে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করেন।

সেই জব্দ তালিকার মতামতে লিখা হয়— ‘যাত্রী (রাশেদ) ব্যাগেজ ঘোষণা প্রদান করেননি। তিনি বারবার যাতায়াত করেন। যাত্রী বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ও বাণিজ্যিক পরিমাণে পণ্য আনয়ন করেছেন মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে। তাই পণ্যগুলো শিফট ইনচার্জের নির্দেশনা মোতাবেক পরবর্তী আইনানুগ নিষ্পত্তির জন্য সাময়িকভাবে আটক করা হলো এবং ডিএম কপিটি বিচার শাখায় প্রেরণ করার জন্য সুপারিশ করা হলো।’

গত ৬ জুন রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে উদ্ধার করা হয় ভারতীয় নাগরিক দিপান্বিতার আইফোন। তবে ঘটনার দিন জব্দ তালিকা প্রস্তুত করার পর ছেড়ে দেওয়া হয় রাশেদকে। এরপর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটি জানা যায়নি।

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাসের মধ্যে কয়েকবার রাশেদ ভারতে আসা-যাওয়া করেন। পাশাপাশি দুবাইয়েও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে তার।

দুটি দেশে রাশেদের ঘন ঘন সফরের বিষয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, মূলত ভারতে চুরি যাওয়া এবং ছিনতাই হওয়া মোবাইল দেশে নিয়ে আসেন তিনি। এক্ষেত্রে নিজে কিছু নিয়ে আসেন। বাকিগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, চোখের সামনেই বিক্রয়কর্মী থেকে চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েছেন রাশেদ। তিনি এখন বেশিরভাগ সময় থাকেন কলকাতায়। সেখানে চোরাই মোবাইল সংগ্রহ করে বিভিন্ন মাধ্যমে দেশে পাঠান। এই রিয়াজউদ্দিন বাজারেই রাশেদের মতো কয়েকজন এ ব্যবসা করে রাতারাতি অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, চোরাই মোবাইল বাংলাদেশে পাচারকালে কয়েকমাস আগেও ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন রাশেদ। ভারতীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ের মোবাইল ফোন চুরির ঘটনায় তাকে কলকাতা অংশের বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১