বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৪ June ২০২৪

সন্তানের শখের বলি মতিউর


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:

সন্তানের বেপরোয়া জীবনযাপনের সূত্রধরে একের পর এক বেরিয়ে আসছে এনবিআর-এর কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমানের সম্পদের পাহাড়। স্ত্রী, সন্তান ও নিজের নামে ও বেনামে দেশ-বিদেশে গড়েছেন শত শত কোটি টাকার সম্পদ। ইতিমধ্যে অবৈধ সম্পদের খোঁজে তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে দুদক।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ও সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সমালোচিত সরকারি কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমানকে। তাকে ওএসডি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের’ তথ্য অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপপরিচালক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এ টিম গঠন করা হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন।

দুদক সূত্র জানায়, এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত ২০০৪, ২০০৮, ২০১৩ ও ২০২১ সালে মোট চারবার অনুসন্ধান করে দুদক। তবে নথিভুক্তির মাধ্যমে এসব অনুসন্ধানের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে দুদক। অর্থাৎ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। পরে মতিউর রহমানকে নিয়ে কমিশনের অনুসন্ধান ও পরবর্তী কার্যক্রম থেমে যায়। দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মইনউদ্দীন আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে সম্প্রতি কমিশন সভায় মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পঞ্চমবারের মতো অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সময়ে অনুসন্ধান টিমের পাশাপাশি পরিসমাপ্তি হওয়া চারটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও তৎসংশ্লিষ্ট নথি খুঁজে বের করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নথি খুঁজে না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথাও জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার আগে কলেজপড়ুয়া সন্তান সৈয়দ মুসফিকুর রহমান ইফাতের ১২ লাখ টাকা দামের ছাগল কেনার জন্য বুকিং, ৫২ লাখ টাকা দামের গরু কেনা এবং দামি গাড়ি ব্যবহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ইফাতকে ছেলে হিসেবে অস্বীকার করেন মতিউর রহমান। এমনকি এই তরুণ তার পরিচিত নয় বলেও দাবি করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বেরিয়ে আসে মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রীর তথ্য। ছাগল-কাণ্ডে সমালোচিত মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিভলী দুই সন্তান নিয়ে বর্তমানে মালয়েশিয়া অবস্থান করছেন।

সূত্র জানায়, একজন সরকারি কর্মকর্তার ছেলের বিপুল টাকায় গরু-ছাগল কেনা নিয়ে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে মতিউর রহমানের বিপুল সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে।

দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নরসিংদী, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় মতিউরের নামে বাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট, প্লটসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পদের খোঁজ মিলেছে। এদিকে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে জমা পড়া অভিযোগটি যাচাই করে কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও চারবার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছিল। তবে প্রতিবারই অদৃশ্য কারণে অভিযোগগুলো নথিভুক্ত হয়ে যায়। এবার কমিশন অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিযোগটি কমিশনের ব্যাংক শাখা থেকে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এতে মতিউর এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, মতিউরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আছে শতকোটি টাকা। তার অবৈধ সম্পদের খোঁজে নেমেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। মতিউরের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ বর্তমানে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান। এ দম্পতির মেয়ে ফারজানা রহমান ইস্পিতা ও ছেলে তৌফিকুর রহমান অর্ণবের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ। এই তালিকায় আছে পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউসের অংশীদারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, জমি ও বিনোদন পার্ক। সন্তানদের নামে রয়েছে ডজনখানেক কোম্পানির মালিকানা।

তবে মতিউর রহমান দাবি করেছেন, তার বিপুল সম্পদের মূল উৎস পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ। তবে সেখানেও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে রয়েছে কারসাজিরও অভিযোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ড. মতিউর রহমানের উত্থান মূলত ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার থাকাকালে। পরে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জায়গায় পদায়ন হয়েছে তার। সাবেক এক চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাটের কমিশনার হিসেবে। সেই সময় বিভিন্ন কোম্পানিতে ভ্যাট ডিমান্ড করে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমন একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের জন্য এনবিআর ও দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি সৈয়দ মুসফিকুর রহমান ইফাতের ব্যবহৃত দুটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন তার পারিবারিক মালিকানাধীন কোম্পানি এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও গ্লোবাল ম্যাক্স প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে। আর এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন মতিউর রহমানের দুই সন্তান তৌফিকুর রহমান অর্ণব ও ফারজানা রহমান ইস্পিতা। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি কোম্পানিতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের নামে কৌশলে প্লেসমেন্ট শেয়ার নেন মতিউর রহমান। আর গ্লোবাল ম্যাক্সের মালিকানা রয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি এসকে ট্রিমস ইন্ডাস্ট্রিজে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান শাহজালাল ইক্যুইটিতেও মালিকানা রয়েছে তার। শুধু ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি নয়, অ্যাসোসিয়েট অক্সিজেন নামে পুঁজিবাজারের আরেক কোম্পানিতে ২৭ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ শেয়ার রয়েছে।

জানা গেছে, মতিউর রহমান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকেন। তার পারিবারিক মালিকানাধীন বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিসও ওই এলাকায়। মতিউর রহমানের ছেলে অর্ণবের নামে অর্ণব ট্রেডিং নামেও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া তার মেয়ের ল্যাম্বারগিনি নামে বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহারের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যার দাম প্রায় ৪ লাখ কানাডিয়ান ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি টাকা। মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকির নামে নরসিংদীর রায়পুরার মরজালে শত বিঘা জমির ওপরে গড়ে তোলা হয়েছে লাকি পার্ক নামে আলিসান রিসোর্ট, যার বর্তমান নাম ওয়ান্ডার পার্ক।

সূত্র জানায়, রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি ব্লকের ৭/এ সড়কের ৩৮৪ নম্বর বাড়িতে স্ত্রীর নামে ৫০১ নম্বর ফ্ল্যাট, একই ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ৫১৯ নম্বর হোল্ডিংয়ে ৭ তলা বাড়ি; আনুমানিক দাম ৪০ কোটি টাকা। এই বাড়ির দোতলাতেই পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মতিউর রহমান।

ময়মনসিংহের ভালুকা থানার সিডস্টোর এলাকার পাশেই প্রায় ৩০০ বিঘা জমির ওপর গ্লোবাল জুতার ফ্যাক্টরি। এই ফ্যাক্টরির চেয়ারম্যান মতিউর রহমান নিজেই। এই ফ্যাক্টরিতে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০০ শ্রমিক কাজ করেন। এই কারখানায় উৎপাদিত জুতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মতিউর রহমান, তার স্ত্রী, পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে রয়েছে ৪০টি প্লট। নরসিংদীর বেলাবতে ৪০ বিঘা জমির ওপর রয়েছে তার বিলাসবহুল রিসোর্ট। রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরে শাহবুদ্দিন পার্কের উল্টোদিকে আনোয়ার ল্যান্ডমার্কের একটি ভবনে চারটি ফ্ল্যাটও আছে তার নামে-বেনামে। যার প্রতিটার দাম প্রায় ৫ কোটি টাকা করে। গুলশানের শান্তা প্রোপার্টিজের একাধিক প্রজেক্টে আছে ৮টি ফ্ল্যাট। গোয়েন্দা তথ্যমতে, মতিউরের একটি ব্যাংক হিসাবে জমা আছে ১১৭ কোটি টাকা।

মতিউর রহমানের জেসিএক্স নামে একটি যৌথ মালিকানাধীন ডেভেলপার কোম্পানিও রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের নতুন প্রজেক্ট বসুন্ধরার আই ব্লকের সুবহান অ্যাভিনিউয়ের ৬৫৭ এ ও ৬৫৭ বি নম্বর প্লটে। ৭১৬ নম্বর রোডে ৯-১০ নম্বর প্লটে ১৪ তলা বাণিজ্যিক ভবনেরও কাজ চলছে।

এ ছাড়া গাজীপুর সদর, রাজধানীর খিলগাঁও মৌজায় বিভিন্ন দাগে ৪৭ শতাংশ জমি, সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় ৮টি খতিয়ানে ৬০ শতাংশ জমি রয়েছে এই রাজস্ব কর্মকর্তার। যার বর্তমান দাম প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

মতিউরের স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় ১৪ শতাংশ, গাজীপুর সদরের ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ ও অন্য দাগে ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি রয়েছে। গাজীপুরে ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণব ও স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে আরও ৪৫ শতাংশ জমির খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গ্লোবাল সুজ লিমিটেড নামে গাজীপুরেও রয়েছে ৭ খতিয়ানে ৬০ শতাংশ জমি। যার মূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা।

রাজধানীর পুবাইলের খিলগাঁও মৌজায় ৪০ বিঘা জমিতে ‘আপন ভুবন পিকনিক অ্যান্ড শুটিং স্পট’ নামে একটি রিসোর্ট করেছেন মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী লায়লা কানিজ। পুবাইলের খিলগাঁও মৌজায় আরও প্রায় ৬০ বিঘা জমি আছে তাদের, এমনটাই দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। মতিউর পরিবারের সদস্যদের রয়েছে অনেকগুলো বিলাসবহুল গাড়ি। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই এবং যুক্তরাষ্ট্রেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তাদের।

বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের আলহাজ আব্দুল হাকিম হাওলাদারের ছেলে মতিউর রহমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স করার পর এমবিএ করেন। শুরুতে ১৯৯০ সালে চাকরি নেন পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনে। পরে ১৯৯৩ সালে ১১তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘কাস্টমস ক্যাডার’ হিসেবে যোগ দেন। পরে কাস্টমসের ১৩ ব্যাচের সঙ্গে যোগ দেন ড. মতিউর রহমান। এবং ২০১৫ সালে কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি পান। মতিউর রহমান ব্রাসেলসে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর, চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার, ভ্যাট কমিশনারসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১