বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৩ April ২০২৪

পরিবেশবান্ধব নগরী

ব্যর্থ সব সরকারি সংস্থাই


রেজাউল করিম হীরা:

কংক্রিটের দাপটে উত্তপ্ত নগর এখন ঢাকা। চারদিকে শুধুই ইট-পাথর। নেই কোনো সবুজের উপস্থিতি। নেই কোনো জলাশয় আর খাল বিল। ফলে স্বাভাবিক তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে, গেল ৬৩ বছরের মধ্যে রাজধানীর তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। নগরীতে কোনো সবুজ বেষ্টনী না থাকার কারণেই দুঃসহ এই দাবদাহ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন রাজধানীকে বসবাসের অযোগ্য শহর বানিয়ে ফেলেছে। পরিবেশবান্ধব নগরী গড়তে ব্যর্থ সব সরকারি সংস্থাই।

নগর গবেষকরা বলছেন, এক সময় প্রতিদিনই স্নিগ্ধ একটি বাতাস আমাদের নগরজীবনকে নানাভাবে শুশ্রুষা দিত। তখন পর্যন্ত ঢাকা ছিল বাংলাদেশের মতোই একটি বৃহৎ সবুজ গ্রাম। কিন্তু মাত্র ৫২ বছরে সেই স্নিগ্ধ শহরটি হারিয়ে গেছে ইটের তৈরি বিশাল বিশাল ইমারতের নিচে। সেই আকাশচুম্বী দালান-কোঠার নিচে পড়ে গাছগুলো চিরতরে হারিয়ে গেছে। গাছ কাটার সেই ধুম আজো অব্যাহত, যখন এই ঢাকার কোনো কোনো আবাসিক এলাকার গাছ নিয়মিতই কেটে ফেলা হচ্ছে। কেন তারা কাটছেন, তার কোনো যৌক্তিক কারণ কেউ দেখান না।

রাজধানীর ৮০ ভাগ এলাকাই কংক্রিটের দখলে। জলাশয় আছে মাত্র ৮ ভাগ। এতে সূর্যের তাপ শোষণ করতে পারছে না এই নগর। ফলে রাজধানী হচ্ছে উত্তপ্ত। ফলে দীর্ঘ ৬৩ বছর পর এ বছরে তীব্র দাবদাহ। এর আগে ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকার তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি।

কিন্তু ঢাকার চার নদী আর কয়েকশ খাল-বিলের এই রাজধানী হতে পারত একটি শীতল ও পরিবেশবান্ধব নগরী। কিন্তু এর কোনোটাই করা হয়নি। কথা ছিল ড্যাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরীর সবুজ ও জলাশয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে। কিন্তু সেটাও হয়নি।

গাছ কাটা, পুকুর আর জলাশয় ভরাট করা, খোলা মাঠ দখল করে বড় বড় ভবন নির্মাণ। সবমিলে বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এই শহর। উন্নয়নের নামে পার্কগুলোও অকেজো করে রাখা হয়েছে দিনের পর দিন।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শহরকে শীতল করার উপকরণগুলো ধ্বংস করে বরং উত্তপ্ত করার উপকরণই বাড়ানো হচ্ছে। একটি আধুনিক শহর গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে সবগুলো সরকারি সংস্থা।

ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালে নগর-পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেড্ডেসকে দিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করে ব্রিটিশরা। এর নাম ছিল ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’। ঢাকা সমতল আর বৃষ্টিপ্রবণ শহর। এ দুটো বাস্তবতা ধরে বিশদ পরিকল্পনার সুপারিশ করেছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ। কিন্তু ওই সুপারিশ পরে আর বাস্তবে রূপ পায়নি। সে সময় ঢাকার চারদিকে চারটি নদীর পাশাপাশি শহরে অনেক খালও ছিল। এই নদীগুলোকে কেন্দ্র করে এক সময় মানবদেহের শিরা-উপশিরার মতো বহমান প্রায় ৫০টি প্রাকৃতিক খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে নদীতে পড়ত। ফলে শহরে জলাবদ্ধতা হতো না। সে সময় ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ।

এরপর ১৯৫৯ সালে ঢাকার জন্য আরও একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। এ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বেশকিছু অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা তৈরি করা হয়। তবে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ১৯৫৯ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৫ লাখ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে ঢাকার জন্য প্রথম মাস্টার প্ল্যান তৈরি হয় ২০১০ সালে। তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় দেড় কোটি। রাজউকের নেতৃত্বে প্রণয়ন করা এই মাস্টারপ্ল্যানের নাম ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)। এই মহাপরিকল্পনা পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গঠনের সূচকের বিবেচনায় ৭০ ভাগের মতো সঠিক বলে নগর বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, মূল ঢাকার ৮০ শতাংশ ভূমি কংক্রিটে আচ্ছাদিত। যাদের ওপর দায়িত্ব ছিল, তারা ব্যর্থ হয়েছে। পরিকল্পনা হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি জানান একটি শহরের ৬০ শতাংশ জায়গায় সড়ক, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়। আর ৪০ শতাংশ জায়গায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবাসহ নগরবাসীর প্রয়োজনের তাগিদে অবকাঠামো করা হয়। অথচ ঢাকার ক্ষেত্রে সেসব নিয়ম-কানুনের কিছুই মানা হয়নি। নগরের আয়তন বিবেচনায় উন্মুক্ত স্থান, প্রশস্ত সড়ক-ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ, বা যে পরিমাণ জলাশয় রাখা দরকার ছিল, তা রাখা হয়নি। এটার প্রধানত দায়িত্ব ছিল রাজউক ও সিটি করপোরেশনের। কিন্তু এই দুই সংস্থার ব্যর্থতায় ঢাকা বাস-উপযোগিতা হারিয়েছে। ইট পাথর সূর্যের তাপ এখন আর শোষণ করতে পারছে না এই নগর। ফলে তাপ ফিরে আসছে ভূখণ্ডে। সে কারণেই এই নাভিশ্বাস পরিস্থিতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান মনে করেন, বনায়ন কমেÑ কংক্রিটের ব্যবহার বাড়াতেই এমন সমস্যা। অপরিকল্পিত এই নগরে বাধাহীনভাবে বায়ু প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগও রাখা হয়নি। সুউচ্চ ভবনে ঢেকে দেওয়া হয়েছে নগর। তার মতে, রাজধানী ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। নগর থেকে জনসংখ্যার চাপও কমাতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঢাকা ছিল বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পরিবেশের শহর। বিশ্বের অন্যতম সেরা উদ্ভাবনগুলো হতো এই শহরকে কেন্দ্র করে। মসলিন, জামদানি থেকে শুরু করে মৃৎ-শিল্পের অন্যতম বড় বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল এই শহর। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে শহরের সামগ্রিক পরিবেশের দ্রুত অবনতি হয়েছে। ঢাকা শহর এখন প্রায় ‘লাইফ সাপোর্টে’ চলে গেছে। এর দ্রুত ও জরুরি চিকিৎসা করতে হলে চিহ্নিত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘লাইফ সাপোর্টে’ থাকা ঢাকাকে বাঁচাতে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন। সেই পরিকল্পনা কী হবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের সৃজনশীল প্রতিভাধর মানুষকে। তাদের ভাবনা থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের নতুন কিছু, যা হয়ত আমাদের মনে সুপ্ত অবস্থায় আছে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১