বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৪ April ২০২৪

ঈদপণ্যে উচ্চমূল্যের থাবা


নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঈদুল ফিতরের বাকি আর সপ্তাহখানেক। এরই মধ্যে জমে উঠেছে ঈদপণ্যের বাজার। বাড়তি চাহিদার অন্যায্য সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সেমাই, পোলাউয়ের চাল, কিশমিশ, গুঁড়া দুধ, নারিকেল, মিষ্টান্ন তৈরির সামগ্রীসহ প্রায় সকল ঈদপণ্যের দাম বেড়েছে। সঙ্গে মসলা পণ্যের দাম যেন আকাশছোঁয়া। এতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক মাস রোজা রাখার পর ঈদে সব শ্রেণির মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। নতুন পোশাকের সঙ্গে সামর্থ্য মতো ঘরে ভালো খাবারেরও আয়োজন করা হয়। এতে বাজারে এক ধরনের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। আর এই চাহিদাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ক্রেতার পকেট কাটতে বাড়ায় পণ্যের দাম। প্রতি বছরের মতো এবারো বাজারে সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এক প্রকার নির্বিকার কর্তৃপক্ষ। প্রকৃতপক্ষেই বাজারগুলোয় মনিটরিং জোরদার করা হয়নি। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিগত কয়েক বছর ঈদ বাজারে মন্দাভাব থাকায় সেমাইয়ের বিক্রি কমে গিয়েছিল। তবে এবার সবকিছু ঠিকঠাক থাকায় বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন সেমাই উৎপাদকরা। খোলা সেমাই প্রস্তুতকারকরা বলছেন, গত বছরের চেয়ে এবার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি চাহিদা রয়েছে। ঈদের আগ মুহূর্তে এটি আরও বাড়তে পারে।

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ উপলক্ষে বাজারে বাহারি নাম ও স্বাদের সেমাইয়ের পসরা সাজিয়েছেন বিক্রেতারা। কিশোয়ান, বিডিফুড, বনফুল, অলিম্পিক, ফুলকলি, প্রাণ, স্বপ্ন সেমাই, ওয়েল ফুড, ডেকো, কোকোলা, কুলসনসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রাম ও ৪০০ গ্রামের প্যাকেটে বিক্রি হচ্ছে সেমাই।

বিক্রেতারা বলছেন, প্রতিদিনের সদায়পাতির পাশাপাশি অনেকেই সেমাই ও মিষ্টান্ন তৈরিরসামগ্রী কিনে রাখছেন। এবার কোম্পানির প্যাকেটে ৫ টাকা দাম বেশি রয়েছে। অপরদিকে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে খোলা লাচ্ছাসহ বাংলা সেমাই খ্যাত খোলা সেমাই। এসব সেমাইয়ে কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা বাড়তি রয়েছে এবার।

রাজধানীর মৌলভীবাজারের সেমাই বিক্রেতা হুমায়ুন গাজী বলেন, সপ্তাহখানেক হয় দোকানে নতুন সেমাই উঠাইছি। প্রথম দিকে বিক্রি খুব একটা হয়নি। এখন বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে দাম বাড়তি এবার।

কদমতলী এলাকার খুচরা বিক্রেতা মো. মিলন হোসেন বলেন, বাংলা সেমাই কেজিপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর খোলা লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। সবচেয়ে বেশি দামে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে হলুদ-কমলা রঙের রঙিন সেমাই, যা গত বছর ছিল ২৫০ টাকা।

দাম বাড়তি রয়েছে জানিয়ে মিলন হোসেন বলেন, কোম্পানির ২০০ গ্রামের লম্বা সেমাইয়ের প্যাকেট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং লাচ্ছা সেমাই ৫০ টাকা থেকে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রিমিয়াম লাচ্ছা সেমাইয়ের প্যাকেটগুলো ২৫০ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে পাওয়া যাচ্ছে।

কারওয়ানবাজার ঘুরেও দেখা গেছে, দোকানগুলোতে খোলা সেমাইয়ের সরবরাহ বেড়েছে। তবে দাম বাড়তি বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এখানকার খুচরা বিক্রেতা মো. মুজাহিদ বলেন, প্রতি কেজি খোলা সেমাই ১০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। আর খোলা লাচ্ছার কেজি ১৮০ টাকা। কোথাও কোথাও ২০০ টাকাও বিক্রি হচ্ছে। রঙিন সেমাইয়ের কেজি ২৬০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে।

কেরানীগঞ্জের সেমাই প্রস্তুতকারক হামিম এন্টারপ্রাইজের কর্নধার মো. আবু বক্কর জানান, গত কয়েক বছর ঈদে সেমাইয়ের বাজার ভালো যায়নি। এবার চাহিদা ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে। তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়াতে হয়েছে আমাদের।

বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, এক সময় ঈদের আগে অনেক বেকারি সেমাই তৈরি করত। আলাদা একটা বাণিজ্য ছিল। করপোরেটদের আধিপত্যে এখন সেটা হারিয়ে গেছে।

এদিকে মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যবহৃত সামগ্রীর দামও রাতারাতি বাড়ছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। সেমাই কেনা গেলেও সেমাই তৈরির দুধ, চিনি কিংবা কিশমিশের খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছেন না নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মাত্র দুদিনের ব্যবধানে কিশমিশের কেজি ৫০ টাকা বেড়ে ৭৫০ টাকায় ঠেকেছে। কিছুদিন আগেও যা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে। তরল দুধের দাম অনেকটা অপরিবর্তিত থাকলেও বেড়েছে গুঁড়া দুধের দাম।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ইতোমধ্যে ডানো, পুষ্টি ইত্যাদি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধ কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে গেছে। অন্য কোম্পানিগুলোও দাম বাড়াতে পারে। নারিকেলের দাম ১৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। চিনির দামও কোথাও কোথাও কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়তি রাখা হচ্ছে। বেড়েছে ফিরনি তৈরির সুগন্ধী চালসহ অন্যান্য পণ্যের দামও।

বাড়তি দরের তালিকায় আছে পোলাওয়ের চালও। কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৭০ টাকা, যা এক বছর আগেও ছিল ১৩০-১৪০ টাকা। এছাড়া গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৭৮০ টাকা, যা গত বছর ৭২০-৭৫০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা, যা গত বছর ১৭০-১৮০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা, যা আগে ১১০-১১৫ টাকা ছিল। বাজারে মিলছে ভারতীয় দেশি আর প্যাকেটজাত চিনি, যা বিক্রি হচ্ছে ১৩৫-১৪৫ টাকার মধ্যেই। এছাড়া চিনিশিল্প করপোরেশনের চিনি খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। ২০০ গ্রামের মিল্কভিটা ঘি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা, যা গত বছর ঈদে বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা।

মসলার বাজারেও দামে যেন নতুন উত্তাপ ছড়াচ্ছে। জানা যায়, এক বছরের ব্যবধানে এলাচের দাম বেড়েছে কেজিতে ১ হাজার টাকা। গত বছর যে এলাচ বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৫৫০ টাকায় সেটির দাম এ বছর ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়া গত ৯ মাসের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের গরম মসলার দাম। গত বছরের জুনে জিরার কেজি ছিল ৭৭০ টাকা। এ বছর মার্চে সেটি ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। দারুচিনির কেজি ছিল ৪৪০ টাকা, বর্তমানে ১৬০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। লবঙ্গের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩২০ টাকা। গত বছর মসলাটি বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪৮০ টাকায়, বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজিতে।

কাওরান বাজারের আরেক বিক্রেতা আলী হোসেন জানান, প্রতি কেজি গুঁড়া হলুদে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকায়, ৪০ টাকা বেড়ে গুঁড়া মরিচ ৪৮০ টাকায়, গুঁড়া ধনে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বাজারটিতে আদা বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি। পেঁয়াজের কেজি ৫০ টাকা ও আমদানি করা রসুন ২০০ এবং দেশি নতুন রসুন ১২০ টাকা। তেজপাতা ২০০ টাকা, কাঠবাদাম ৩০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার টাকা ও কাজুবাদাম ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, রোজা-ঈদসহ কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান এলে দেশে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তাই ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে হলে সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, অনিয়ম পেলেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক অসাধু ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। এতে রোজার মধ্যে কিছু পণ্যের দাম কমতে শুরু করে। আশা করা যাচ্ছে ঈদের আগে পণ্যের দাম আরো কমবে। এজন্য অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১