আপডেট : ০৭ March ২০২৪
এম এ বাবর: পবিত্র রমজান মাস শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার থেকে। তাই অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে ফল ও ইফতার পণ্য কিনতে বাজারে ভিড় করছেন ভোক্তারা। কিন্তু বাজারের কোথাও যেন স্বস্তির নিশ্বাস নেই। শুল্ক কমালেও বেড়েছে দাম। ইফতার পণ্য সামাগ্রীর দাম এখনই সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজার সিন্ডিকেট চক্রের অপতৎপরতায় রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় ক্রেতারা। সরবরাহ ঠিক থাকলেও রোজা ঘিরে দুই মাস আগেই ছোলা, মসুর ডাল, চিনি, খেজুর, মাছ-মাংসসহ সবধরনের ইফতার পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলা নিয়ে নানা জটিলতার কারণে সার্বিকভাবে পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে পণ্যের দামেও সেটির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, রমজানের আগেই বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেমনে বাড়তে শুরু করেছে, তাতে এবার না খেয়েই রোজা রাখতে হয় কি না সেটাই ভাবতেছি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে পাঁচজনের সংসার চালাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানান তিনি। হোটেল ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, এবার ইফতারসামগ্রী দিগুণ দামে বিক্রি করতে হবে। গত মাসে যে পেঁয়াজ কিনছি ৯০ টাকা করে, আজকে সেইটা কিনে আনলাম ১২০ টাকা করে। চাল, ডাল, বেসন, বেগুন, তেল, চিনি- সব জিনিসের দাম কেবল বেড়েই যাচ্ছে। তাই এবার ৫ টাকায় কোনো ইফতারী আইটেম রাখা যাবে না। বিশেষ করে এবার বেগুনি, পিয়াজুসহ চপ ১০ টাকার নিচে বিক্রি করা যাবে না। বসুন্ধরার বহেরা ক্যাটারিং-এ এবার ইফতার তালিকা থেকে দেখা গেছে, তাদের ইফতার মেন্যুর সব আইটেমের দাম প্রায় দিগুণ করা হয়েছে। বহেরা ক্যাটারিং-এর ম্যানেজার মোহন জানান, ১ কেজি হালিমের (বিফ) মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ টাকা, যা গত রমজানে ছিল ৩৫০ টাকা। জিলাপি প্রতিকেজি ৫০০ টাকা, যা আগে ছিল ৩০০ টাকা। নান প্রতিটি বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা, চিকেন সরমা প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ৭০ টাকা, দই বড়া প্রতি পিস ৬০ টাকা, চনা চাট মসলা প্রতিবক্স ২০০, তন্দুরী চিকেন রোল প্রতি পিস ১৪০ টাকা, বাসমতি চালের জর্দা প্রতিবক্স ১৮০ টাকা, চিকেন রেশমি কাবাব ২৫০ টাকা, চিকেন বটি কাবাব ২০০ টাকা, চিকেন তান্দুরি কাবাব প্রতিপিস ১০০ টাকা, বিফ সামি কাবাব প্রতিপিস ৭০ টাকা, স্প্রিং রোল প্রতিপিস ৩০ টাকা, ভেজিটেবল রোল প্রতিপিস ৪০ টাকা, ডিম চপ প্রতিপিস প্রতি পিস ৩০ টাকা, ভেজিটেবল সমুচা প্রতিপিস ৪০ টাকা ও ভেজিটেবল পাকুরা প্রতিপিস ২০ টাকা। রমজানে দ্রব্যমূল্য যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে জন্য গত জানুয়ারিতে চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতাগ্রহণ করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে, গত আটই ফেব্রুয়ারি চাল, চিনি, তেল ও খেজুরের আমদানি কর কমিয়েও দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর প্রায় একমাস পার হয়ে গেলেও ভোক্তারা এর কোনো সুফল পাননি। উল্টো বাড়তে দেখা গেছে চিনি ও খেজুরের দাম। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও কিছু ‘অসাধু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ’ বাড়তি মুনাফা পেতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পণ্যের সরবরাহ ও বাজার মনিটরিং ঠিক রাখতে না পারলে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বছরের অন্যান্য সময়ে তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে প্রতিবছরই রমজান মাসে চিনি, খেজুর ও ভোজ্য তেলের দাম বাড়তে দেখা যায়। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের বাজারে ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিসেরই দাম বেড়ে গেছে। ফলে রমজান উপলক্ষে যেন নতুন করে এসব পণ্যের দাম আর না বাড়ে, সে জন্য চলতি মাসের শুরুতে চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও খেজুরের আমদানি কর কমিয়ে দেয় সরকার। এর মধ্যে চাল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। এছাড়া রোজার অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। একইভাবে, ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানিতেও কর কমিয়ে দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য মতে, রমজান উপলক্ষে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং পাম তেল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। গত এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম গড়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে টিসিবি। এছাড়া অপরিশোধিত চিনি আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি মেট্রিক টনে আমদানি শুল্ক দেড় হাজার টাকা থেকে কমিয়ে এক হাজার টাকা করা হয়েছে। আর পরিশোধিত চিনির ক্ষেত্রে টনপ্রতি আমদানি শুল্ক তিন হাজার টাকা থেকে কমিয়ে করা হয়েছে দুই হাজার টাকা। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর এসে দেখা যাচ্ছে, বাজারে পণ্যগুলোর দাম তো কমেইনি, বরং চিনি ও খেজুরের দাম বেড়ে গেছে। এক সপ্তাহ আগেও বাজারে যেখানে প্রতিকেজি খোলা চিনি ১৩৫ টাকা বিক্রি হচ্ছিলো, পাঁচ টাকা বেড়ে সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। একইভাবে, গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে খেজুরের দাম মানভেদে প্রতিকেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। সরকারের বিপণন সংস্থা ‘ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ’ (টিসিবি) গত বুধবার যে পণ্যতালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে গত একমাসের ব্যবধানে গরুর মাংস, ব্রয়লার মুরগির মাংস, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ, হলুদ, দারুচিনি, তেজপাতা ইত্যাদি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এক সপ্তাহ আগে ঢাকায় খোলা বাজারে এক কেজি গরুর মাংসের সর্বোচ্চে দাম ছিল ৭২০ টাকা। বুধবার সেটি বিক্রি হতে দেখা গেছে ৭৫০ টাকা দরে। একইভাবে, প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ১৯৫ টাকা থেকে বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। অন্যদিকে, গত এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম গড়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে টিসিবি। এছাড়া ছোলার দাম পাঁচ শতাংশ, ডালের দাম দুই শতাংশ, শুকনা মরিচের দাম পাঁচ শতাংশ, হলুদের দাম চার শতাংশ, দারুচিনির দাম পাঁচ শতাংশ এবং তেজপাতার দাম কেজিতে গড়ে প্রায় তিন শতাংশ বেড়ে গেছে। বেসরকারি হিসেবে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। বিপুল এই চাহিদার বেশিরভাগই পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। এক্ষেত্রে সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপ-সহ বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ীগোষ্ঠী ব্রাজিল, আর্জেটিনা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে থাকে। এরপর পরিশোধন শেষে মূল্য নির্ধারণ করে সেগুলো বাজারজাত করা হয়। এখন আমদানিকারকরা বলছেন, চিনি আমদানির ক্ষেত্রে সরকার সম্প্রতি যতটুকু শুল্ক কমিয়েছে, সেটি এর দাম কমানোর জন্য যথেষ্ঠ নয় । বিশ্ববাজারে এখন চিনির দাম আগের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে আবার ডলারের দাম এবং পণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের খরচ অনেক বেড়েছে বলেন দেশের শীর্ষ একটি চিনি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর যে চার পণ্যের শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কম শুল্ক কমেছে চিনিতে। চিনি আমদানিতে কেজিতে শুল্ক কমেছে ৬৮ পয়সার মতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এই খরচের তুলনায় সরকার নামমাত্র শুল্কছাড় দিয়েছে, যা চিনির দাম কমানোর জন্য যথেষ্ঠ নয়। এছাড়া দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের কারণে ঋণপত্র (এলসি) খোলা নিয়ে নানা জটিলতা থাকায় চাইলেও আগের মতো চিনি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে। এটিও চিনির দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। অন্যদিকে, রমজানে দেশে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন খেজুরের চাহিদা থাকে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এই চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়। এক্ষেত্রে শুল্কহার বেশি হওয়ায় খেজুরের দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রন্ট ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। চলতি অর্থবছর থেকে এনবিআর খেজুরকে বিলাসী পণ্য হিসেবে মূল্য ধরছে। ফলে আমদানি করা ১২০ টাকা কেজি দরের খেজুরে ২১০ টাকা শুল্ক দিয়ে বর্তমানে ৩৩০ টাকা কেজি দরে বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে। এজন্যই খেজুরের দাম বেশি, বুধবার ঢাকায় একটি মতবিনিময় সভায় বলেন সিরাজুল ইসলাম। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত ওই সভায় তিনি আরও বলেন, গত ৩৫ বছর ধরে আমি খেজুর আমদানি করি, কিন্তু কখনো এত শুল্ক দিতে হয়নি। কাজেই দাম কমাতে হলে শুল্কহার আরও কমাতে হবে। দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দেশে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে কোনো সংকট নেই। কিন্তু কিছু ‘অসাধু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ’ বাড়তি মুনাফা পেতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রমজানে মাসে বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ অবস্থায় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখাটাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের হয়তো সদিচ্ছার আছে। কিন্তু মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চাহিদার তুলনায় পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে না পারলে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে বলেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান বলেন, খুচরা বাজারে কেউ যেন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি করতে না পারে, সে জন্য মনিটরিং জোরদার করা হবে। রমজানে যারা পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেন তিনি।
গতকাল বুধবার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুল বাতেন রাজধানীর বাড্ডা বাজারে আসেন ইফতারসামগ্রী কেনাকাটার জন্য। কিন্তু এসে দেখেন সবকিছুর দাম বাড়তি। এ সময় তিনি ক্ষোভ নিয়ে বলেন, বাজারে এসে দেখি সব জিনিসের দাম দ্বিগুণ। দামশুনে শুনে মুখ কালো করে চলে যাচ্ছে। অথচ কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে না। এ কেমন কথা! এভাবে দাম বেড়ে গেলে আমরা ইফতার করব কি দিয়ে!
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১