বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৮ October ২০২৩

সারা বিশ্বের শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শুভ "প্রবারণা পূর্ণিমা" উদযাপন


চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব হলো প্রবারণা পূর্ণিমা l ভিক্ষুসংঘের বর্ষাবাস পরিসমাপ্তির এই পবিত্র দিনকে কেন্দ্র করেই প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করা হয়। প্রবারণা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য একটি আবশ্যক বিধিবদ্ধ নিয়ম। প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পালিত একটি ধর্মীয় উৎসব. যা আশ্বিনী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব উদযাপন করা হয়।
পালি ভাষারূপ ‘পবারণা’। আর সংস্কৃত ভাষা থেকে ‘প্রবারণা’ শব্দটি এসেছে। আত্মশুদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণের আয়োজন হলো প্রবারণা। সহজ কথায় বললে অসত্য ও অকুশল কর্মকে বর্জন করে সত্য ও কুশল কর্মকে বরণ করা।
প্রবারণার অর্থ দাঁড়ায় ‘নিষেধ করা’, দোষত্রুটি স্বীকার, শিক্ষা সমাপ্তি, ‘অভিলাষ পূরণ’, ‘আশার তৃপ্তি’, ‘প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা’ প্রভৃতি।

প্রবারণা পূর্ণিমার অপর নাম ‘আশ্বিনী পূর্ণিমা’। ‘প্রবারণা পূর্ণিমা‘ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাব্রত পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এই পূর্ণিমা তিথিতে সব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ।

বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে সাথে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিন মাস বর্ষাব্রত পালন করেন।
এই তিন মাস ভিক্ষুরা বিহারে অবস্থান করেন। তাই বর্ষাব্রত পালন শেষে ভিক্ষুরা আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা পালন করেন। অর্থাৎ এই দিনে ভিক্ষুগণ পরস্পরের কাছে তাঁদের পূর্বকৃত ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যার মাধ্যমে বুদ্ধের শাসনের উৎকর্ষ সাধিত হয় এবং ভিক্ষুসংঘের কল্যাণ সাধিত হয়।

শনিবার (২৮ অক্টোবর) সারাদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই দিনটি অতীব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেছেন। সাধারণ গৃহীরা সকাল থেকে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পূজা উত্তোলন, সূত্র পাঠ এবং অষ্টশীল ব্রত পালন করে সারা বিশ্বের শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে সমবেত প্রার্থনা করেছেন। জগতের সকল প্রাণীর দুঃখ হতে মুক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা করেছেন।
বিকালে ও একইভাবে বিহারে সমবেত প্রার্থনা করে জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করেন।

প্রতিটি বৌদ্ধ বিহার এবং যেখানে বৌদ্ধরা বাস করেন সেখান থেকে সকালের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের পর সন্ধ্যায় ফানুস উত্তোলন করে থাকেন। ফানুস কে আকাশ প্রদীপ ও বলা হয়ে থাকে।

উল্লেখ্য যে, ত্রিপিটক ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে জানা যায়, শ্রাবস্তীর জেতবনে একসময় ভগবান বুদ্ধ অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বিপুলসংখ্যক প্রগাঢ় মিত্রভাবাপন্ন ভিক্ষু কোশল রাজ্যের এক আবাসে বর্ষাবাসে রত ছিলেন। ভিক্ষুগণ শঙ্কিত ছিলেন এই ভেবে যে যদি তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে হয়তো তাঁদের ধ্যান-সাধনার পথে বাধার সৃষ্টি হবে।

এ জন্য কেউ কারো সঙ্গে কোনো প্রকার বাক্যবিনিময় না করেই মৌনভাবে বর্ষাবাস পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বর্ষাবাস সমাপ্ত হলে মহামানব গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুগণের কাছে তাঁদের বর্ষাবাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ বললেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে কোনোরূপ কথা না বলে মৌনভাবে বর্ষাবাস অতিক্রান্ত করেছেন। ভিক্ষুগণের এমন উত্তরে বুদ্ধ অসন্তুষ্ট হন। কারণ একসঙ্গে বসবাস করতে গেলে নিজেদের মধ্যে ভুলত্রুটি কিংবা মতানৈক্য হওয়া স্বাভাবিক। তাই বলে ভিক্ষুগণ মৌনব্রত পালন করতে পারেন না। বুদ্ধ ভিক্ষুদের আদেশ প্রদান করলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, আমি অনুজ্ঞা প্রদান করছি—বর্ষাবাসিক ভিক্ষুগণ দৃষ্ট, শ্রুত অথবা আশঙ্কিত ত্রুটি বিষয়ে প্রবারণা করবে।’ বুদ্ধ প্রবারণাকে ভিক্ষুদের জন্য পরস্পরের মধ্যে সংঘটিত অপরাধ থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় এবং অবশ্য পালনীয় নিয়ম হিসেবে নির্দেশ করেছেন।
বুদ্ধের এই আদেশ থেকে প্রবারণার মাহাত্ম্য অনুধাবন করা যায়। একে অন্যের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে যে অনন্য দৃষ্টান্ত প্রবারণা পূর্ণিমা শিক্ষা দেয়, তা শুধু ভিক্ষুসংঘের জন্য নয়, বরং সব মানবজাতির জন্য অনুকরণীয়। কারণ এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সম্প্রীতির শিক্ষা।

প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে পরবর্তী এক মাস অর্থাৎ কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত কঠিন চীবর দান সম্পন্ন হয়ে থাকে। বর্ষাবাস সমাপ্তকারী ভিক্ষুগণ কঠিন চীবর গ্রহণ করেন। প্রবারণা পূর্ণিমার পবিত্র দিনে বৌদ্ধ উপাসক-উপাসিকাগণ পরিষ্কার পোশাকে বৌদ্ধ বিহারে সমবেত হয়ে বুদ্ধপূজা করেন, ভিক্ষুদের আহার্য দান করেন, পঞ্চশীল, অষ্টশীল গ্রহণ করেন এবং বিকেলে ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমার এই পবিত্র দিনের আকর্ষণীয় একটি দিক হলো সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানোর উৎসব। সর্বস্তরের মানুষ ফানুস ওড়ানো উপভোগ করে। ফানুস মূলত ওড়ানো হয় বুদ্ধের কেশ ধাতুর প্রতি পূজা ও সম্মান প্রদর্শনার্থে। কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ গৃহ ত্যাগ করার পর ভাবলেন, তাঁর কেশরাশি প্রব্রজিতের পক্ষে অন্তরায়। তাই তিনি কেশকলাপ কেটে রাজমুকুটসহ ঊর্ধ্বাকাশে নিক্ষেপ করেছিলেন। তাবতিংশ স্বর্গের দেবগণ তাঁর কেশরাশি নিয়ে চুলমনি চৈত্য প্রতিষ্ঠা করে পূজা করতে লাগলেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই সশ্রদ্ধচিত্তে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উড়িয়ে থাকেন। এই দিনে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা ঘরে ঘরে ভালো রান্নার আয়োজন করেন। সর্বোপরি ধর্মীয় আচরণবিধি অনুসরণ করে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপিত হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমা শিক্ষা দেয় ক্ষমাশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ, পরস্পরের প্রতি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমেই কল্যাণের পথে অগ্রসর হওয়া

প্রবারণার মূলে রয়েছে,
রাজকুমার সিদ্ধার্থ (পরবর্তীতে গৌতম বুদ্ধ) জাগতিক সকল দুঃখমুক্তি লাভের আশায় রাজ্য, রাজত্ব, ভোগ-বিলাস, ধনকুম্ভ সব ত্যাগ করে সংসার পরিত্যাগ করেছিলেন শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে। তিনি সারথি ছন্দককে সঙ্গে নিয়ে অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে অনোমা নদীর তীরে পৌঁছালেন। রাজ-আবরণ ছন্দককে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি সন্ন্যাস-ব্রত গ্রহণ করলেন। এরপর ভাবলেন, ‘আমি এখন সন্ন্যাসী, রাজকীয় বাহারি চুল কী-বা প্রয়োজন?’ তরবারি দিয়ে চুলের গোছা কেটে নিয়ে মনে মনে অধিষ্ঠান করলেন, ‘যদি বুদ্ধ হওয়ার মতো গুণ আমার মধ্যে থেকে থাকে তাহলে ঊর্ধ্বদিকে নিক্ষিপ্ত চুলের গোছা মাটিতে না পড়ে আকাশে স্থিত থাকুক।’
এই সংকল্প করে তিনি চুলের গোছা উপরের দিকে নিক্ষেপ করলেন। বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার ! একটা চুলও মাটিতে পড়ল না। বৌদ্ধধর্ম মতে, স্বর্গের ইন্দ্ররাজ চুলগুলো হীরা, মণি, মানিক্যখচিত স্বর্ণপাত্রে ধারণ করে তাবতিংস স্বর্গে উক্ত কেশ-ধাতু স্থাপন-পূর্বক একটি চৈত্য নির্মাণ করেন এবং এই চৈত্যের নাম রাখা হয় ‘চুলামনি চৈত্য’। স্বর্গের দেবতারা এখনও এর পূজা করে থাকেন। এ পুণ্যময় পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনার পর ভারতের সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন। এদিনেই তার তিন মাসের বর্ষাবাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।

কথিত আছে এই তিথিতে গৌতম বুদ্ধ ৬০ জন প্রশিক্ষিত শিষ্যকে ধর্ম প্রচারণার জন্য বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন এবং তাদের বলেন, ‘‘চরত্থ ভিকখবে চারিকং, বহুজন হিথায় বহুজন সুখায়’’ অর্থাৎ, তোমরা বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য চারিদিক ছড়িয়ে পড়।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১