বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ৩০ October ২০২১

পদ নিয়ে অসন্তোষ তৃণমূলে


দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক কাঠামো ঢেলে সাজানো শুরু করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কিন্তু বড় দুই দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে কমিটিতে পদ পাওয়া নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকায় স্বার্থের দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে নানা গ্রুপ ও উপদল হয়েছে। এতে কোথাও কোথাও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে যারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় থাকেন না, তাদের দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় বিএনপির তৃণমূলেও রয়েছে অসন্তোষ।

দেশের বিভিন্ন এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির থানা এবং জেলা পর্যায়ের অনেক নেতাই এখন আর এলাকায় যান না। তাদের কথা, মামলার ভয়ে তারা এলাকায় যেতে পারেন না। সংগঠন করবেন কীভাবে। ফলে ঢাকা অথবা বড় শহরে থাকেন। এ অবস্থায় নানা হামলা ও মামলার ভয় উপেক্ষা করে যারা এতদিন এলাকায় কোনোরকম দলের কার্যক্রম টিকিয়ে রেখেছেন, নতুন কমিটির জন্য তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এলাকায় না থেকেও তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন অনেকে।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কেরামত আলী খান। তিনি ১৫ বছর ধরে সাধারণ সম্পাদক। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকছেন। তিনি বলেন, এখন বিএনপি করে মামলা খাওয়া ছাড়া আর কোনো আশা নেই। এলাকায়ও দলের নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয়। অনেকেই মামলার আসামি। আর মিছিল মিটিং করলেই গায়েবি মামলা। বিএনপি করা এখন কঠিন। আমি তো অবসর নিতে চাই। তারপরও দল সাধারণ সম্পাদক পদে নাম রেখেছে। আমি কী করব। তার কথা, এই পরিস্থিতি সারা দেশেই। তৃণমূলে বিএনপির কোনো কার্যক্রম বলতে কিছু নেই তারপরও দলীয় পদ নিয়ে অসন্তোষ হলে করার কিছুই নেই। 

অন্যদিকে নানা কারণে আওয়মী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিরোধ। উপজেলা পর্যায়ে মূলত নানা প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি, নানা উন্নয়নমূলক কাজকে কেন্দ্র করেই আওয়ামী লীগে বিভক্তি। স্থানীয় পর্যায়ে অধিপত্য ধরে রাখতেও জেলা এবং কেন্দ্রীয় নেতারা এই গ্রুপিং-এ জড়িয়ে পড়ছেন। অনেকে আবার বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতার লোক পরিচয়ে প্রভাব সৃষ্টি করছে। বাইরে থেকেও দলে লোক ঢুকেছে। তারাও আলাদা গ্রুপ। তবে সুযোগ সন্ধানী নয় বরং আদর্শ কর্মী তৈরির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। পরীক্ষিত কর্মী এবং মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী পরিবারের বাইরে কাউকে তৃণমূলে দলীয় পদ দেওয়া হবে না-এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে দলটি।

এ সব বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূলকে চাঙা করতে মাঠে নেমেছে দলের শীর্ষ নেতারা। যদিও নানা কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব ও ভুল বোঝাবুঝি আছে। এই দ্বন্দ্বের কারণ অনুসন্ধানে প্রত্যেক বিভাগে কমিটি কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরীক্ষিত কর্মী ও আদর্শ কর্মীরাই দলীয় পদ পাবেন।

এদিকে একের পর এক এসব বিশৃঙ্খল কারণে হতাশ বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। অদৃশ্য শক্তির দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে বিএনপির বিপর্যয় অনিবার্য বলে মনে করছেন এসব নেতারা। অনিয়ম আর অসন্তোষের বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও রাজপথে নামছে দলের নেতাকর্মীরাই। কোথাও হচ্ছে পাল্টা কমিটি, কোথাওবা বিদ্রোহ। তৃণমূল নেতাদের দাবি, নানা সুবিধার বিনিময়ে অযোগ্যদের কমিটিতে পদ দেওয়ায় তৃণমূলে ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের দিকে যাওয়া অভিযোগ অনেকের। আর দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছে, কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি না হলে অনিয়মের পাশাপাশি বিভাজনও ঠেকানো সম্ভব নয়।

সম্প্রতি বিভিন্ন কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগে নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রের যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে নিজ দলের নেতাকর্মীরা। খোকন জানান, যারা দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির অবস্থা আরো ভয়াবহ। যেখানে কেন্দ্র থেকে আব্দুল হাই ও কামরুজ্জামান রতনকে নিয়ে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পরই পাল্টা কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিদ্রোহী কমিটির আহ্বায়ক ভিপি মাসুম জানান, যারা দলকে মেধাশূন্য করছে তাদেরকে নেতা-কর্মীদের হিসাব হিসাব দিতে হবে।

অন্যদিকে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সদস্য আখতার হামিদ ডাবলু বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হলেও এর পরিসর বর্তমানে ছোট হতে হতে ঘরকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এভাবে একটি রাজনৈতিক দল চলতে পারে না।

বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাজী খায়রুজ্জামান শিপন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কমিটি অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছি, তদন্ত করা হয়েছে। এমনকি কমিটির কার্যকারিতাও নেই তারপরেও অথর্ব কমিটি অদৃশ্য কারণে টিকে আছে।

আর নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার জানান, যারা জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে চান তারা নিজ বলয়ে কমিটি করতে চান। তবে, নেতা হতে হলে জনসম্পৃক্ততা এবং কর্মীদের সমর্থন থাকতে হয়।

দাবি আদায়ের সক্ষমতা অর্জনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে অনিয়ম, অসন্তোষ দূর করার চেষ্টা চলছে বলে জানান আরেক নেতা। বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, নানা কারণে গেল ১০ থেকে ১৫ বছরে কাউন্সিল করা যায়নি। তবে, কেন্দ্রীয় নেতারা চেষ্টা করছেন সংকট কাটিয়ে উঠার জন্য।

এদিকে পরীক্ষিত কর্মী ছাড়া অন্য কাউকে আওয়ামী লীগের পদ দেওয়া হবে না আওয়ামী লীগে। দলটির নেতারা বলছেন, নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে যেসব নেতা অন্য দল থেকে আসা সুযোগ সন্ধানীদের দলে জায়গা করে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে আওয়ামী লীগ।

গত ১৭ অক্টোবর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে রংপুরের পীরগঞ্জে জেলেপল্লিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনার মূলহোতা সৈকত মণ্ডল রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ছাত্রলীগ কর্মী। সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক হামলার বিভিন্ন ঘটনায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আসে এমন আরো কয়েক ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তারের পর যাদের বহিষ্কার করা হয় সংগঠন থেকে। প্রশ্ন হলো, অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকেই যে দলটির জন্ম, সেই দল কিংবা তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা কিভাবে সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়ায়।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, সকল ধর্মের মানুষরা স্বাধীনভাবে তাদের নিজ নিজ আচার-অনুষ্ঠান ও কর্মকাণ্ড পালন করবে এটা আওয়ামী লীগের আদর্শ। কোনো নেতা-কর্মী আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন করুক তা কখনই কাম্য নয়। তৃণমূল পর্যায়ে যেসব সুযোগ সন্ধানী দলে অনুপ্রবেশ করে তাদের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ নিজের স্বার্থরক্ষা করতেই দলে জায়গা করে দেন। আমরা আদর্শিক নেতা-কর্মীদের চাই, সুযোগ সন্ধানীদের চাই না। সুযোগ সন্ধানীদের দলে অনুপ্রবেশে যারা সহযোগিতা করবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান শেখ সেলিম।

সাম্প্রদায়িক হামলায় বেশকিছু নেতাকর্মী জড়িত থাকার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন, সম্প্রতি সংখ্যালঘু হামলায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকে সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার করা হয়েছে। কোনো নেতা-কর্মী যদি ভুল কাজ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অন্য দল থেকে আসা বহিরাগতদের নানা অপকর্মে দুর্নাম হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের-এমন মত নেতাদের। বলছেন, আগামীতে মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী পরিবারের বাইরে কাউকে দেওয়া হবে না দলীয় পদ। শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসছে। দলটির সভাপতিমণ্ডলীর  সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান জানান, তরুণ প্রজন্মের যারা রাজনীতিতে আসতে চায় তাদের জন্য সুযোগ থাকবে। তবে, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে দলের ক্ষতি করছে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১