বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৫ October ২০২১

নুসরাতের সাজানো মামলা আইনের গুরুতর লঙ্ঘন


এক ঘটনায় তিনটি মামলা দায়ের। প্রথম মামলা খারিজের পর দ্বিতীয় মামলাকে পাশ কাটিয়ে তদন্তে গেছে তৃতীয় মামলা। রাজধানীর গুলশানে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামে এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হচ্ছে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। একটি ঘটনাকে ঘিরে একই বাদীর ‘আত্মহত্যা প্ররোচনা’ মামলায় হেরে ‘হত্যা মামলা’ দায়েরের ঘটনাকে নজিরবিহীন বলেও মনে করছেন তাঁরা।

উচ্চ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, একই ঘটনায় একাধিক মামলা হতেই পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু নিয়ম রয়েছে। সাধারণত প্রথম মামলার কার্যকারিতা সম্পন্ন হলে দ্বিতীয় মামলা চালু হওয়ার কথা। আবার প্রথম মামলাটি প্রমাণ হলে দ্বিতীয় মামলা সক্রিয় করার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় যেহেতু প্রথম মামলায় বাদীর অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি, সেহেতু দ্বিতীয় মামলায় অবশ্যই যেতে হবে। দ্বিতীয় মামলা তদন্ত না করে তৃতীয় মামলায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া একই ইস্যুতে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করারও কোনো সুযোগ নেই।

জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল মুনিয়ার লাশ উদ্ধারের পর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন নুসরাত। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং অন্যান্য আলামত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও তদন্ত করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, ‘আত্মহত্যার কোনো প্ররোচনার ঘটনা ঘটেনি।’ দীর্ঘ চার মাস তদন্তের পর গত ১৯ জুলাই আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। শুনানি শেষে ১৮ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আদালত। একই সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় এ মামলা থেকে সায়েম সোবহান আনভীরকে অব্যাহতি দেয় আদালত। পুলিশের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নুসরাতের দেওয়া নারাজি আবেদনও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে খারিজ করে দেয়।

এদিকে, মুনিয়াকে ‘হত্যা করা হয়েছে’ দাবি করে ২ মে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। তিনি মামলায় অভিযুক্ত করেন হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনকে। কিন্তু প্রথম মামলা চলমান থাকায় এ মামলাটির কার্যকারিতা স্থগিতের আদেশ দেয় আদালত। প্রথম মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে সবুজের মামলাটি চালু হওয়ার কথা। কিন্তু এর মধ্যে গত ৬ সেপ্টেম্বর একই ঘটনা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে কথিত ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা করেন প্রথম মামলার বাদী নুসরাত। আদালত সেটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দেয়।

অভিযোগ উঠেছে, মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার বড় ভাই আশিকুর রহমান সবুজের করা হত্যা মামলা থেকে আসামি শারুন চৌধুরীকে রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধচক্র। আইন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এর মাধ্যমে আইন লংঘন হয়েছে বলে মনে করেন সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নুসরাতের করা প্রথম মামলা কার্যকারিতা হারালে ভাই সবুজের করা দ্বিতীয় মামলাটি তদন্তে আসবে। কিন্তু এটি না করে নুসরাতের করা তৃতীয় আরেকটি মামলা গ্রহণ ও তদন্তের নির্দেশ বিধিমতো হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, মুনিয়ার ভাইয়ের মামলা কেন ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। ওই মামলা থাকা অবস্থায় কিভাবে আরেকটি মামলা হয়।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আবু বলেন, ‘মুনিয়ার ভাইয়ের করা দ্বিতীয় মামলা স্টে ছিল নুসরাতের করা প্রথম মামলা পরিচালনার স্বার্থে। এখন যেহেতু প্রথম মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে তাই দ্বিতীয় মামলা চলবে। দ্বিতীয় মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে আর কোনো মামলা হতে পারে না। পূর্ববর্তী মামলায় বাদী যদি কোনো গাফিলতি হয়েছে বলে মনে করে তাহলে সে নারাজি দিতে পারে। কিন্তু একই বিষয়ের ওপর আবারো মামলা করতে পারে না। এভাবে মামলা হয় না, আইনে নেই।’

এ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আরো বলেন, ‘দ্বিতীয় যে মামলা করা হয়েছে সেটা নিষ্পত্তির আগে একই বিষয়ের ওপর তৃতীয় মামলা হতে পারে না। জুডিশিয়াল নোটিশে যখন সেই মামলা আসবে তখন খারিজ হয়ে যাবে। একই বিষয়ে একাধিক মামলা চলতে পারে না। যেহেতু একই ঘটনায় হত্যা মামলা আগেই করা আছে এ মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনে মামলা করার সুযোগ নেই। সে (নুসরাত) নারী বলে চাইলেই মামলা করবে, এটা হতে পারে না। নুসরাতের এই মামলা টিকবে না। কোর্ট বিষয়টি জানতে পারলে খারিজ করে দেবে।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী আরফান উদ্দিন খান বলেন, ‘আত্মহত্যা প্ররোচনার’ পরে একই বাদীর ‘হত্যা মামলা’ দায়ের নজীববিহীন। আমার জীবনে এমন মামলা দেখিনি। তিনি বলেন, বড়ভাই (আশিকুর রহমান সবুজ) যে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন সেই মামলাটি স্থগিত থাকতে পারে না। কোর্টের উচিত ছিল এটি একই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করা। যেহেতু আত্মহত্যা রেজাল্ট এসেছে কোর্ট পিবিআইকে এই হত্যা মামলা দিতেই পারে না বলে আমি মনে করি। আত্মহত্যা যেখানে মেডিকেলি প্রমাণিত সেখানে হত্যা মামলা হয় কী করে। এই মামলা টিকবে না, পিবিআই বা যাকেই দিক ফাইনাল রিপোর্ট দেবে। এটি ১৫৪ ধারা কভার করে না।

আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু বলেন, একই বাদী দুই ধরনের মামলা করায় সুবিধা পাবে বিবাদী। কারণ এক বাদী কিভাবে একেক সময় একেক ধরনের মামলা করেন তা তদন্ত কর্মকর্তার সামনে আসবে। আমার মনে হয় নুসরাত তার ভাইয়ের দায়ের করা মামলা গোপন করেছে, না হলে আদালত দুই মামলারই তদন্ত করার নির্দেশ দিত। কারণ একই ঘটনার একই সঙ্গে পৃথক দুটি তদন্ত হতে পারে না। বাদী নিজে বলেছে আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা, ময়নাতদন্তে প্রমাণ হয়েছে আত্মহত্যা। সেসময় মুনিয়ার ভাই একটা হত্যা মামলা করে। সেই হত্যা মামলার রিপোর্ট এখন স্থগিত। এই অবস্থায় মুনিয়ার বোন আবার আরেকটা হত্যা মামলা করে। এটা পুলিশকে হয়রানি ছাড়া আর কিছু না। ভাইয়ের মামলা কেনো নুসরাত গোপন করলেন। নাহলে তো দুই মামলাই একসঙ্গে তদন্ত হওয়ার কথা।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলাই যখন ফাইনাল রিপোর্টে আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ মেলেনি সেখানে হত্যা মামলা আসবে কোথা থেকে। নতুন করে মামলা তদন্ত করে তো কোনো লাভ হবে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট একই, আলামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা একই। সেখানে নতুন করে তদন্ত করে কি পাবে।

আইন বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(২) অনুসারে কোনো অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাবে না। অর্থাৎ এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে কোনো ফৌজদারি মামলায় একাধিকবার শাস্তি প্রদান করা যাবে না। এই বিষয়টি ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ধারা ৪০৩ এ উল্লেখ করা হয়েছে। ধারা ৪০৩ অনুযায়ী কোনো উপযুক্ত আদালত কোনো মামলায় একজন ব্যক্তির বিচার করে তাকে শাস্তি বা খালাস প্রদান করলে ওই আদেশ বলবৎ থাকা অবস্থায় একই অপরাধের দায়ে পুনরায় তার বিচার করা যাবে না। আদালতের কাছে সত্য গোপন করে এ ধরনের মামলা যদি কেউ করেন তাহলে আদালত তা খারিজ করে দেবেন।

অন্যদিকে, গত ২ মে মুনিয়াকে ‘হত্যা করা হয়েছে’ উল্লেখ করে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করেন মুনিয়ার বড় ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। সবুজ বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে শারুনের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল। এ কারণে শারুন মুনিয়ার মাধ্যমে আনভীরের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত তথ্য জানার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে অসম্মতি জানালে মুনিয়ার ওপর ক্ষিপ্ত হন শারুন। এর প্রতিশোধ নিতে শারুনই সহযোগীদের নিয়ে মুনিয়াকে হত্যা করে। সবুজের দাবি, তার বোন মুনিয়াকে শারুন চৌধুরী ও তার সহযোগীরা ঘটনার দিন ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে ঢুকে হত্যা করে। পরে তার বোনের লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে কৌশলে বাসা থেকে বের হন শারুন।

 

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১