বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৯ September ২০২১

কনডেমড সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন দুই হাজারের বেশি আসামি


স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার অভিযোগে দীর্ঘ ২০ বছর কারা প্রকোষ্ঠের অন্ধকার কক্ষে দিন কাটান খুলনার শেখ জাহিদ (৫০)। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভগের রায়ে মুক্তি পান গত বছরের সেপ্টেম্বরে। যুবক বয়সে কারাগারে গিয়ে মধ্য বয়সে মুক্তি পান তিনি।

জানা যায়, ২০০০ সালের ২৫ জুন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন যুবক জাহিদ শেখ। তারপর থেকেই তিনি কারাগারের কনডেমড সেলে টানা ২০ বছর ধরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। কিন্তু মামলা প্রমাণিত না হওয়ায় জাহিদকে গত বছরের ২৫ আগস্ট খালাসের রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত বিচারের আগে কনডেম সেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের রাখার বৈধতা নিয়ে কথা বলেন জাহিদ।

তিনি জানান, বিচারের তিনটি ধাপ রয়েছে। বিচারিক আদালত, উচ্চ আদালত ও সর্বোচ্চ আদালত (আপিল বিভাগ)। বিচারিক আদালত যেহেতু চূড়ান্ত বিচার নয়, সেহেতু একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দীর্ঘদিন কনডেমড সেলে রাখার যৌক্তিকতা কতটুকু। মৃত্যুদণ্ডের একটা মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে ২০ বছর সময় লেগেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাহিদের মতো আরো দুইজন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি খালাস পান আপিল বিভাগের রায়ে।

বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারের দুই হাজারেরও বেশি মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি কনডেমড সেলে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে আসামিকে কারাগারের যে কক্ষে রাখা হয় তাই কনডেমড সেল নামে পরিচিত। ৮ ফুট বাই ৮ ফুটের ওই কক্ষে নেই কোনো জানালা। টয়লেটও সেই কক্ষেই। নির্জন সেই কক্ষে একাই থাকতে হয়। তবে মাসে দুইবার স্বজনদের সাথে ফোনে কথা বলার সুযোগ পান আসামিরা।

জানা যায়, বিচারিক আদালতের রায়ের পর সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে দণ্ড কার্যকর করতে আনুমানিক ১২ থেকে ১৪ বছর অনেক ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় লাগে। ততদিন পর্যন্ত একজন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিকে কনডেমড সেলেই রাখা হয়।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছেই। প্রতিবছর যতসংখ্যক ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে, এর অর্ধেকও নিষ্পত্তি হয় না। ফলে দিনদিন এর সংখ্যা বাড়ছে। করোনা, আদালতের বার্ষিক ছুটি এবং বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ ভাঙার কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে ভাটা পড়ে যায়। বর্তমানে হাইকোর্টে আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, হলি আর্টিজান হামলা, নুসরাত হত্যা, রিফাত শরিফ হত্যা মামলাসহ বেশকিছু আলোচিত মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় আছে। এছাড়া আপিল বিভাগে চাঞ্চল্যকর নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ হত্যা ও পিলখানা হত্যাসহ শতাধিক আপিল রয়েছে শুনানির অপেক্ষায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ১৫ থেকে ২০ বছর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের অপেক্ষায় কনডেমড সেলে থাকার পর খালাস পেয়েছেন কয়েকজন। এরপরই মূলত প্রশ্ন উঠে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই বছরের পর বছর কনডেমড সেলে রাখা না রাখা নিয়ে।

চলতি বছর তিনজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কনডেম সেলে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেন। তারা চান না আর কনডেমড সেলে থাকতে। তারা কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কনডেমড সেলে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর মামলাটির শুনানি হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত কারাবন্দি ও কনডেম সেলের সংখ্যা, কারাগারের সংস্কার, ব্যবস্থাপনা, কনডেম সেলের সুযোগ-সুবিধাসংক্রান্ত প্রতিবেদন চেয়েছেন।

তিন আসামির আইনজীবীর দাবি-যেহেতু মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, সে কারণে আগেভাগেই কনডেম সেলে রাখা ঠিক হবে না। আপিল ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার পরই এ সেলে রাখা যেতে পারে। এর আগ পর্যন্ত তাদের জন্য কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় অন্য আসামিদের সঙ্গে রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একজন আসামির বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলে সেই দণ্ড কার্যকরের জন্য উচ্চ আদালতের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া শেষে সে অনুমোদন নিতে সময় লাগে ১২ থেকে ১৪ বছর। এসময়ের মধ্যে আসামিরা কনডেম সেলেই থাকেন। চূড়ান্ত বিচারে গিয়ে অনেকের ফাঁসি কার্যকর হয়, আবার অনেকেই নিরপরাধ প্রমাণিত হয়। তাই চূড়ান্ত বিচারের আগে কনডেম সেলে রাখা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভবনা তৈরি হয়।

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে ৯৬৯টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১২৬টি। এখন শুনানির অপেক্ষায় আছে ৮৪৩টি মামলা। এসব মামলায় সারা দেশে ৬৮ কারাগারের কনডেম সেলে বন্দি আছে ২ হাজারেরও বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। যারা বর্তমানে কারাগারের কনডেম সেলে আছেন। হাইকোর্টের তিনটি বেঞ্চে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি চলছে। সে হিসাবে চলতি বছর যেসব আসামি নিম্নআদালতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হচ্ছেন, তাদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি হবে ২০২৬ সালে। ফলে একজন ফাঁসির আসামিকে হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। আর হাইকোর্ট যদি কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, তাহলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে তাকে।

তিনজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, একটি মৃত্যুদণ্ডের মামলার শুনানি করতে হাইকোর্টে ছয় বছর আর আপিলে লাগে ছয় থেকে ১০ বছর। গড়ে ১০, ১২, ১৪ এমনকি ১৮ বছরও সময় লাগে। এমনও দেখা গেছে আপিল বিভাগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে অনেককে। তারা প্রায় ২০ বছরের অধিক সময় ধরে কনডেম সেলে ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, তারা ফিরে এসে বাস্তব জীবনে আর কাউকে খুঁজে পান না। পরিবারের আর কোনো মানুষের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ থাকে না। তাদের পরিবার ভেঙে যায়। আমরা এখানে প্রশ্ন তুলেছি প্রাথমিকভাবে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলেই তাকে ডেথ সেলে নেওয়া যাবে কিনা। নাকি মৃত্যুদণ্ডাদেশ চ্থড়ান্ত হতে হবে। পরবর্তীতে তিনি যদি খালাস পান তাহলে কি তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব জীবন থেকে? তিনি বলেন, এই প্রশ্নটি উঠেছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও। আমাদের দেশে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানি করতে মোটামুটি ছয় বছর সময় লাগে। এখন আমরা শুনানি করছি ২০১৫ এবং ১৬ সালের ডেথ রেফারেন্সের। চলতি ২০২১ সালের ডেথ রেফারেন্স যে ফাইলগুলো হচ্ছে সেগুলোর শুনানি হবে ২০২৬ বা ২০২৭ সালের আগে নয়। এ ক্ষেত্রে তারা কি ডেথ সেলে থাকবেন? না তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যবস্থায় আনতে হবে।

অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কনডেম সেলে নেওয়ার আগে সাধারণ বন্দিদের মতো আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। চূড়ান্ত বিচারে ফাঁসির সাজা বহাল হলেই কেবল নেওয়া হয় মৃত্যু সেলে। সে নজিরই তুলে ধরা হয়েছে উচ্চ আদালতে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটা আদেশ দিয়েছে কনডেম সেলে নেওয়া যাবে তখন, যখন আপিল খারিজ হয়ে যাবে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও খারিজ হয়ে যাবে তখন তাদের এখানে নেওয়া যাবে।

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১