বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৯ August ২০২১

প্রথিতযশা শিল্পীদের দৃষ্টিতে মুর্তজা বশীর


বাংলাদেশের একজন প্রধানতম চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর। করিতকর্মা প্রতিভা হিসেবে পরিচিত এই শিল্পী চিত্রশিল্পে নিজস্ব ধরন প্রতিষ্ঠা করেছেন। সম্মানজনক পেশাজীবনের মধ্য দিয়ে কাজকে ক্রমশ নিয়ে গেছেন বিমূর্ত বাস্তবতার দিকে। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, কার্টুনিস্ট ও ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী মুর্তজা বশীর। তার বাবা উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব-একাধারে চিত্রকর, কবি, শিক্ষক, লেখক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, শিল্পনির্দেশক, গবেষক ও মুদ্রাবিশারদ। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়। এত পরিচয় নিয়েই মুর্তজা বশীর বাংলাদেশের শিল্পকলার আকাশে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দিয়েছেন অনুজসমদের। নিজের জীবন, আন্দোলন, সংগ্রাম, প্রতিবাদ আর নিজের সৃষ্টিকে এ দেশের সঙ্গে, এ দেশের মানুষের সঙ্গে শিল্পী মুর্তজা বশীরের মিলিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণভাবে অনন্য। এ যাত্রা তাঁর নিজেরই যাত্রা। তাঁর এ যাত্রা আমাদের নিজেদের চেনারও যাত্রা। এ যাত্রা আমাদের নিজ যোগ্যতায় বৈশ্বিক হয়ে ওঠার। শিল্পী মুর্তজা বশীর আমাদের আধুনিক বাংলাদেশ গঠনের দিশারীদের একজন। তিনি আন্দোলনের জন্য অনেক কার্টুন ও ফেস্টুন এঁকেছেন। তার কার্টুনগুলো দেশ ও ভাষার জন্য লড়াই এবং ত্যাগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মুর্তজা বশীরের চিত্রকলায় নাগরিক জীবন থেকে বেশি এসেছে গ্রামীণ জীবনের কথা। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন মুর্তজা বশীর। চলচ্চিত্রে তিনি সমাজবাস্তবতা ও শিল্পিত রুচির স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘নদী ও নারী’র সঙ্গে তিনি আদ্যোপান্ত জড়িয়ে ছিলেন চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখক, শিল্পনির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে। কারওয়াঁ চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ তাঁর লেখা। ‘ক্যায়সেকহু’ চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এসবের পূর্বে ১৯৬১ সালে লাহোরে থাকাকালীন চলচ্চিত্রকার ডাব্লিউ. জেড. আহমেদের সহকারী রূপে চাকুরিতে নিয়োজিত ছিলেন। মুর্তজা বশীর মূলত চিত্রশিল্পী হলেও সংস্কৃতির অন্যান্য শাখায়ও তিনি বিচরণ করেছেন। বিশেষ করে সাহিত্য সাধনায় এবং চলচ্চিত্রশিল্পে তিনি অনেকটা সময় সক্রিয় থেকেছেন। চিত্রকলায় তিনি বাস্তববাদী ও সমাজমনস্ক হলেও সাহিত্যে তিনি অনেক রোমান্টিক। তবে তাঁর ছোটগল্পের ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সমাজবাস্তবতার প্রাধান্য দেখা যায়। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্বাধীনতার দাবিতে আয়োজিত বাংলাদেশ চারু ও কারুশিল্পীদের মিছিলের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব জহির রায়হান এই কীর্তিমান মুর্তজা বশীরের গল্পগ্রন্থ ‘কাঁচের পাখির গান’-এর ভূমিকায় লিখেন এ কটা লাইন, ‘মুর্তজা বশীর একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। নিঃসঙ্গ চিত্রকর। নিঃসঙ্গ লেখক। তাঁর জীবনের এই নিঃসঙ্গতার অন্ধকারের মধ্যে থেকেও তিনি চান হীরের মতো উজ্জ্বল দ্যুতি। তিনি মানুষকে ঘৃণা করেন। ঘৃণা করেন বলেই হয়তো তাদেরকে গভীরভাবে ভালোবাসতেও জানেন। আর এটাই হচ্ছে মুর্তজা বশীরের রচনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।’ মুর্তজা বশীর তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮০ সালে একুশে পদক, ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৯ সালে বাংলা ১৪০০ বছর উপলক্ষে চট্টগ্রাম আইনজীবী সহকারী সমিতি কর্তৃক সম্মাননা, ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম ইয়ুথ কয়ার প্রদত্ত একুশে মেলা পদক, ২০০৩ সালে সুলতান স্বর্ণপদক, ২০০৭ সালে কবি চন্দ্রাবতী স্বর্ণপদকসহ আরো বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং সম্মান অর্জন করেছেন তিনি। তিনি বিভিন্ন চারুকলা প্রদর্শনীতে জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ও বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য।

বরেণ্য এই চিত্রশিল্পীর জন্ম ও মৃত্যু এই মাসেই। তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন দেশের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পীরা। আজকের পর্বে আছেন নারী ভাস্কর আইভি জামান ও দেশীয় পটশিল্পের কাণ্ডারি শম্ভু আচার্য। তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সালেহীন বাবু-

 

আইভি জামান

ভাস্কর আইভি জামান বলেন, মুর্তজা বশীর একজন সিনিয়র শিল্পী ছিলেন। ড. শহীদুল্লার ছেলে মুর্তজা বশীর । তিনি নিজের মতো করে আঁকতেন। আমরা তাকে শ্রদ্ধা করতাম। এখনো করি। আমরা উনার কাজ মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। সব মিলিয়ে উনি একজন অগ্রজ শিল্পী। ‘মুর্তজা বশীর সমসাময়িক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক, কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী। আমরা চারুকলায় স্যারদের প্রদর্শনী দেখতাম। উনার প্রদর্শনী দেখে আমরা পেইন্টিংয়ের সাথে পরিচিত হয়েছি। বলতে পারেন উনাদের কাজ দেখেই আমরা অগ্রসর হয়েছি। আমাদের যে শিল্পীরা আছেন উনাদের শো, উনাদের কাজ, তাদের চলাফেরা  আমাদের মনে গেঁথে থাকে। এগুলো আমাদের সামনে চলার এক শক্তি বলে মনে করি। বিশেষ করে শেষের দিকে আমরা কায়া গ্যালারিতে দেখতাম মুর্তজা বশীর প্রায় আসতেন। নাকে অক্সিজেন লাগিয়ে। আমরা দূর থেকে উনাকে শ্রদ্ধাভরে দেখতাম। আমরা কাছে যেতাম না। আমাদেরও বয়স হয়েছে। কিন্ত উনাদের কাছে আমরা অনেক ছোট। আমরা মনে করি না স্যার মারা গেছেন। স্যারের শিল্পকর্ম আছে। মুর্তজা বশীর স্যার আমাদের শ্রদ্ধার জায়গায় উপবিষ্ট। আমরা ভাবি স্যার আছেন। যতদিন মুর্তজা বশীর স্যারের শিল্পকর্ম আছে উনি বেঁচে থাকবেন তার কাজের মধ্য দিয়ে। একজন শিল্পীর মৃত্য হলেই কিন্তু তার প্রস্থান নয়। যেমন ড. শহীদুল্লাহ বেঁচে আছেন। উনার মতো আরো জ্ঞানীরা বেঁচে আছেন। উনাকে নিয়ে এ পর্যন্ত প্রচুর বই বের হয়েছে। আরো বের হচ্ছে।  নতুন যারা চারুকলায় ভর্তি হচ্ছে তারাও কিন্তু ওই বইয়ের মাধ্যমে তার সম্পর্কে জানতে পারবে। আমরা যারা চিত্রকলায় জড়িয়ে আছি আমরা মনে করি মুর্তজা বশীর স্যার একটা ইতিহাস। ইতহাস যেমন কোনোদিন মুছে যায় না। তেমনি তিনি কখনো মুছে যাবেন না। উনি বেঁচে আছেন । থাকবেন। তার দর্শন পেয়েছি। তাদের কাজ দেখেছি। তাদের গাম্ভীর্য দেখেছি। মুর্তজা বশীর স্যার লিখতেন। লেখার অভ্যাস ছিল। স্যার ডাইরি লিখতেন।

 

শম্ভু আচার্য

দেশীয় পটশিল্পের কাণ্ডারি শম্ভু আচার্য বলেন, আমি যমুনা রিসোর্টে ২০০৭ সালে গ্যালারি কায়ার ব্যবস্থাপনায় ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছিলাম। সে সময় বশির স্যার ছিলেন। বশির স্যার আর আমরা একসাথে ছিলাম। বশীর স্যার আর আমি পাশাপাশি বসেই কাজ করতাম। উনি একটা মেয়ের ছবি এঁকেছেন। আমি বললাম স্যার মেয়ের ছবির নাম রাখেন নয়নতারা। স্যার আমার নামটি পছন্দ করলেন। পরে আমরা যখন সবাই খাওয়াদাওয়া করলাম তখন স্যার একটা ফুল কিনলেন। বললেন, শম্ভু এই ফুলটা আমি ছবিতে আকব। আমাকে বলেছিলেন শম্ভু তোমার এই বানানো রঙ দিয়ে আমরা কাজ করব। স্যার এরপর আমাকে অনেকবার বলেছিলেন রঙ দেওয়ার জন্য। যদিও পরে তা আর দেওয়া হয়নি। এটি আমার কাছে অপরাধবোধ কাজ করে। আমার রঙ দিয়ে মুর্তজা বশীর স্যার, হামিদুজ্জামান স্যার, নিতুন কুন্ড ছবি এঁকেছেন। স্যারের কোনো তুলনা হয় না। মনেপ্রাণে  একজন সত্যিকারভাবে ভালো মানুষ ছিলেন। তার কথায় বর্ণনায় কি বলব আর। আমি স্যারকে খুব মিস করি। আমার কাছে উনি মারা যান নাই। উনার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না।  এই যে আমি যে একজন অজপাড়াগায়ের একজন পটচিত্রশিল্পী  আমার পাশেই স্যার ছিল। এই ৩ দিন। এত সাবলীল। স্যারের কাজগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। তার ছবিগুলো নিয়ে প্রদর্শনী করা উচিত।  এই প্রদর্শনী করলে সেমিনার হবে, আলোচনা হবে। এখনকার প্রজন্মের যারা আছেন তারা ছবিগুলো দেখবেন। ছবি দেখে তারা স্যার সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাবেন। একটা দিশা খুঁজে পাবেন। কারণ তিনি ছিলেন একজন দিশারী। তার ছবিগুলো যেখানে যেভাবেই আছে সবগুলো একত্রিত করে প্রদর্শনী করা। উনার কাজ ছিল সহজ সরল কাজ। আর আমিও সহজ সরল কাজগুলো করি। আমার কাজগুলো দেখে স্যার অনেক খুশি হয়েছিলেন। আমি স্যারের সামনে বসে কাজ করেছি। উনি আমার কাজের প্রশংসা করেছেন। আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া। আসলে সহজ জিনিসটা খুব কঠিন। সহজ কথা, সহজ গান সহজে গাওয়া যায় না।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১