আপডেট : ২৩ July ২০২১
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সংকল্প’ কবিতার ‘থাকব না’কো বদ্ধ ঘরে/দেখব এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ/যুগ থেকে যুগান্তরে’ পঙক্তির মতোই শিশুরা বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ থাকতে চায় না। মানতে চায় না কোন বাঁধা। কোন সীমার মধ্যে থাকতে চায় না শিশুরা। কারণ চঞ্চল হরিণীর মতো শিশুদের মন। মন যা চায় সেরকম নিজের মতো করেই চলতে-ফিরতে চায় তারা। কিন্তু করোনা মহামারীর প্রাদূর্ভাবের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত তাদের জীবন। বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, বন্ধুর সঙ্গে খেলার মাঠে যেতে পারছে না। ভাইরাসের প্রকোপের কারণে তারা আজ ঘরবন্দি। দেড় বছর আগেও শিশুদের সময় কাটত বিদ্যালয়, কোচিং, বাড়ির কাজ প্রস্তুতি ও খেলার মাঠে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির ব্যস্ততায় সকাল শুরু হতো তাদের। কিন্তু অদৃশ্য এক ভাইরাসের কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে বিদ্যালয়ে যাওয়ার ব্যস্ততা নেই। প্রতিদিনকার রুটিন হয়ে গেছে এলোমেলো। আজ যেন তাদের অখণ্ড অবসর। ঘুম থেকে ওঠার, বিদ্যালয়ের যাওয়ার, খেলার মাঠে যাওয়ার তাড়া নেই। কেবলই অপেক্ষা। বিদ্যালয় খোলার অপেক্ষা। খেলার মাঠে যাওয়ার অপেক্ষা। বন্ধুর সাথে সময় কাটানোর অপেক্ষা। পাশাপাশি বাল্যবিয়ের মতো অসুখ আকড়ে ধরেছে মেয়ে শিশুদের। চার দেয়ালে বন্দি থেকে শিশুদের গ্রাস করছে নানা ধরনের সমস্যা। সবচেয়ে মারাত্মকভাবে বেড়েছে শিশুদের মানসিক চাপ। করোনাভাইরাসের প্রভাবের কারণে শিশুরা সারা দিন-রাত ঘরে আবদ্ধ শুয়ে বসে সময় পার করার কারণে দেখা দিতে পারে অশান্ত আচরণ, কথা না শোনার প্রবণতা, জেদি হওয়ার প্রবণতা ইত্যাদি। পাশাপাশি অবসাদ তাদেরকে আকড়ে ধরতে পারে। শিশুর কোনো কথায় ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে তৈরি হতে পারে চুপ করে থাকার প্রবণতাও। এমনটাই আশঙ্কা করছেন শিশু ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘদিন ঘরে বন্ধি থাকায় মানসিকের পাশাপাশি শিশুদের শারীরিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চার দেয়ালে সময় পার করতে মোবাইল ও ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে তারা। মোবাইল বা টিভিতে বুঁদ হয়ে ঘরের এককোণে পড়ে থাকছে তারা। এতে অল্প বয়সে চোখের সমস্যায় পরতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ আর মানসিক চাপ ছাড়াও বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে জেদ, অতিরাগ এবং একাকীত্ববোধে ভোগার মতো মানসিক অসুবিধাও দেখা যাচ্ছে বলে অভিভাবকমহল সামাজিক মাধ্যমে জানাচ্ছেন। এছাড়া বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ও লকডাউনের মতো কর্মসূচির ফলে শিশুদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্থ হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে শিশুর নানাবিধ বিকাশের জন্য কোনো পরিবারই একমাত্র আদর্শ নয়। কারণ প্রায় সব পরিবারেই অর্থনৈতিক টানাপড়েন, কলহ, অপর্যাপ্ত আবাসস্থল, পূর্ণ মাত্রায় শিশুর পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়ার অভাবের মতো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে এখন থেকেই শিশুর মধ্যে অতিমাত্রায় রাগ, জেদ এবং হিংসাত্মক আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন। এছাড়া পরিবার বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে কেউ করোনায় সংক্রমিত হলে বা মৃত্যুবরণ করলে সেই আতঙ্কও অনেক শিশুকে উদ্বিগ্ন করে তোলে এবং তুলতে পারে। শিশুরা বন্ধু-বান্ধব বা সমবয়সিদের সাথেই বেশি সময় কাটাতে ও মিশতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সেই সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত। ফলে একাকীত্ব ঘোচাতে ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যা শিশুদের ইন্টারনেট আসক্তি বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে নেতিবাচক পথে পা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া ইন্টারনেট আসক্তির সাথে মানসিক স্বাস্থ্যেরও রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। অতিরিক্ত মোবাইল ও ইন্টারনেট আসক্তির কারণে নিয়মিত বা অপর্যাপ্ত ঘুম থেকে দূরে সরে রয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বন্ধ বিনোদন কেন্দ্রগুলোও। রয়েছে দফায় দফায় লকডাউনও। ফলে ঘরের বাইরে শিশুদের বের হওয়ার কোন জোঁ নেই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলামের মতে, প্রত্যেকটি মানুষের শরীরে যেমন পুষ্টির প্রয়োজন, তেমনি পুষ্টির প্রয়োজন মস্তিষ্কেরও। মস্তিষ্কের পুষ্টি হলো ইতিবাচক, ভালো চিন্তা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা ইন্টারনেটে দীর্ঘ সময় পার করলে মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। পরিবর্তন আসে চিন্তায়ও। এর ফলে ভালো বা ইতিবাচক চিন্তার বদলে মস্তিষ্কে ভর করে বদ বা খারাপ চিন্তা। পাল্টে যায় আচার-ব্যবহারও। তাছাড়া দীর্ঘক্ষণ ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত বেশি। শিশুরা মোবাইল হ্যান্ডসেট অনেকক্ষণ ব্যবহারের ফলে স্মৃতি ও দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়। শরীরে টিউমারও হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় নাক কান ও গলা ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. মাহবুব আলমের মতে, দীর্ঘক্ষণ হেডফোন ব্যবহারের ফলে কানে নানা ধরনের সমস্যা হয়। তাই দীর্ঘসময় হেডফোন ব্যবহার করা অনুচিত। দীর্ঘসময় মোবাইলের ছোট্ট পর্দায় তাকিয়ে থাকলে চোখেরও সমস্যা হয়। যদিও এ ক্ষতিগুলো খুব সহজে বোঝা যায় না। লম্বা সময় পর ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো ধরা পরে। বিশেষ করে শিশুদের স্মার্ট ডিভাইস থেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ মোবাইলের রেডিয়েশনটা শিশুদের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর বলে মনে করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের রিসার্স ফেলো হাসান নিটোলের মতে, দীর্ঘদিনের আবদ্ধ অবস্থা শিশুর সব ধরনের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। একটা শিশু যখন হাঁটতে শেখে, কথা বলতে, দৌঁড়াতে শেখে, ছবি আঁকে, নাচে এইসব জিনিস শিশুর বিকাশের একটা অংশ। শিশুর সব ধরনের বিকাশ, বুদ্ধির বিকাশ এই পরিস্থিতিতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একইসঙ্গে শিশুর পুষ্টির অভাব হলে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকবে। ফলে করোনার একটা বড় প্রভাব শিশুদের ওপর পড়বে বলে মনে করেন তিনি। সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা রিথিংকের পরিচালক লুলু আল মারজানার মতে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধের প্রভাব শিশুদের ওপর লম্বা একটা সময় থাকবে। একইসঙ্গে শিশুর আচরণগত পরিবর্তন, বিষণ্ণতা, মানসিক ট্রমাও সৃষ্টি হতে পারে। স্কুল নেই, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা নেই, খেলা নেই, ঘরের চার দেয়াল ছাড়া কোথাও বেড়াতে যাওয়ার উপায় নেই। ফলে চারিদিকে শুধু শঙ্কার আবহ শিশুর মনোজগতের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তবে ঘরবন্দি শিশুদের জন্য সময় কাটানোর কিছু পরামর্শ দিয়েছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ। যেমন: দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক রুটিন করে দেওয়া, বিভিন্ন কাজে, পড়াশোনায় শিশুকে পুরস্কৃত করা, ছবি আঁকা, গান ও কবিতা শেখার ব্যবস্থা করা, বাসার ছোট ছোট কাজের দায়িত্ব দেওয়া, শখ গড়ে তুলতে সাহায্য করা, শিশুকে নিয়ে শিশুর চাওয়ার মতো সময় কাটানোসহ শিশুতোষ সিনেমা দেখা, বই পড়া, অল্প সময় কার্টুন দেখা ইত্যাদি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১