বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১১ July ২০২১

অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খানের গ্রামের ইতিকথা


(পর্ব-এক)

ভাস্কর শিল্পী আইভি জামান

সময়টা উনিশ ঊনআশি, গচিহাটা রেলওয়ে স্টেশন ঘেঁষে ছোট্ট গ্রাম, গ্রামের নাম শহশ্রাম। অজপাড়াগাঁ, ছোট ছোট পুকুর, নারিকেল ও সুপারি গাছে ঘেরা। ঘন সবুজ গাছ দিয়ে সাজানো গ্রামটি। কিছু লাল টিনের ঘরবাড়ি চোখে পড়ে। স্টেশন থেকে নেমে পায়ে হাঁটার সরুপথ। পূর্বপুরুষের কবরস্থান পাশে ফেলে সরুপথ দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। নাকে পুকুরের আগাছার গন্ধ যেন আলিঙ্গন করে নেয়। প্রকৃতির যত রূপ সেখানে গেলে দেখতে পাবেন। অজপাড়াগাঁ বিদ্যুতের ব্যবস্থা তখন ছিল না। সন্ধ্যা হলেই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, আর জোনাকি পোকার আলো যেন কালো ক্যানভাসে অবিরত আলোর লাইন দিয়ে ছবি এঁকে চলেছে। রাতে শান্তস্নিগ্ধ আকাশ, গাছ-গাছালি, নদী-নালা মিলেমিশে যেন কালো কালি দিয়ে আঁকা ছবি। মাঝরাতে ঝাঁক বেঁধে শিয়ালের মিছিল হুক্কা হুয়া ডাক কানে আসে। কুয়াশা যেন বৃষ্টির পানির মতো টিনের চাল বেয়ে টুপটাপ ঝরে পড়তে থাকে। কেরোসিনের আলো সামনে না নিলে রাতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। টিনের ঘরবাড়ি মাঝখানে আঙ্গিনা চারদিকে গাছে ঘেরা। এক বাড়ি থেকে পাশের বাড়ি সহজেই যাওয়া যায়।

বাড়ির পেছনে উন্মুক্ত ফসলের সবুজ ক্ষেত পুকুর ও বাঁশ-বাগান। দুচোখ যতদূর যায়, ফসলের ক্ষেত যেন আর শেষ হয় না। নীল আকাশ দিগন্ত আর ফসলের ক্ষেত যেন মিলে মিশে একাকার। পুকুরপাড়ে বাঁশ ও পুরাতন কাঠ দিয়ে তৈরি ঘাট। ঘরের ভেতর থেকে ধানক্ষেত দেখা যায়, আর সামনে ট্রেনের হুইসেলের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। আমি যেন গল্পের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছি। ট্রেনের ঘণ্টা ও হুইসেলের আওয়াজ ব্রিটিশ সরকারের আমল থেকে অবিরাম বেজেই চলেছে। ঢং... ঢং...ঢং । কিছু দূর যেতেই শতবর্ষের দালান চোখে পড়ল। সে ঘরে গিয়ে দেখলাম। ঘরের ছাদে কিছু কিছু আস্তর খুলে পড়েছে। তিন রুমের একটি দালান চোখে পড়ল। তিনটি দরজা ছয়টি জানালা নিয়ে বাড়িটি। ঘরে গিয়ে বসতেই, আমাকে এক  মহিলা  জড়িয়ে ধরলেন, ওনার নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি বললেন, আমার নাম তাপসী রাবেয়া। বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি বছর হবে। পরণে নীল রঙের চুল পার, সাদা শাড়ি পরিহিত। গায়ের রং পরিষ্কার ধবধবে সাদা না হলেও কাছাকাছি। মাথায় কাপড় দেওয়া দেখতে পেলাম। একটু পরে আট থেকে দশ বছরের মধ্যে প্রায় পনেরো জন মেয়েকে ঘরে আসতে দেখলাম। হাতে বই-খাতা  দেখতে পেলাম বাংলা ও আরবি। এসেই পড়তে বসে গেলো। যে যেখানে পারে বসেই আওয়াজ করে পড়তে শুরু করলো। আমি মনে মনে ভাবছিলাম এখানেও কোচিং চলে। জিজ্ঞেস করতে সাদা শাড়ি পরিহিত মহিলা বললেন, আমি গ্রামের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ওদের আরবি ও বাংলা ভাষায় সব ধরনের বই পড়তে সাহায্য করছি প্রায় পনেরো বছর হবে। যারা পড়তে চায় বা আগ্রহ আছে তাদের উনি পড়ান। এখান থেকে কেউ স্কুলে যায়। আবার কখনো কিছু মেয়েদের বিয়ে হয়ে, অন্য গ্রামে চলে যায়। অক্ষরজ্ঞান দেওয়া।  আমি কোনো পারিশ্রমিক দাবি করি না। আর ওদের দেবার ক্ষমতা নেই। আমার শ্রদ্ধায় মাথা নত হলো। আমি খুব খুশি হলাম, ভালোও লাগছে। আমি মহিলাকে খেয়াল করতে থাকলাম। ইতিমধ্যে ঘণ্টা দুই পরে মেয়েরা সবাই যে যার মতো বাড়ি ফিরে গেল। তাদের বয়স আট থেকে নয় দশ বছর হবে। পরণে নানা রংয়ের উজ্জ্বল শাড়ি এক পেঁচে করে পরা। দেখতে  কাপড়ের তৈরি পুতুলের মতো মনে হলো । সব কিছুই আমার খুব ভালো লাগছে। আমি সেই সাদা শাড়ি পরিহিত মহিলা রাবেয়া খাতুনের  সাথে থাকলাম। দেখলাম নানা রংয়ের কাপড় তিনি বিছানায় বালিশের পাশে রাখা। আমার কৌতূহলবশত জানতে চাইলে তিনি বলেন। আমার রংগুলো খুব ভালো লাগছে তাই রেখেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোথায় এতো সুন্দর উজ্জ্বল রংয়ের কাপড় পেয়েছেন। তখন তিনি বললেন, পুরনো কাপড় থেকে সংগ্রহ করে টুকরো করে কেটে ধুয়ে নিয়েছেন। তখন দেশে এতো গার্মেন্টস ছিল না, কাপড়ের অভাব ছিল। পুরনো কাপড় কিনতে পাওয়া যেতো। উনি বললেন, এই কাপড়গুলো ওনার কোনো প্রয়োজনে আসবে না কিন্তু রং তার পছন্দ, তিনি কিন্তু শিল্পী না। কিন্তু শিল্পসত্তা তার মধ্যে ছিল। ওনার বাবা ছিলেন একজন, সওদাগর কলকাতায় ব্যবসা করতেন। সেই সূত্রে তিনি ব্রিটিশ সরকারের আমল থেকে মুদ্রা সংগ্রহ করতেন। শুনে আমার আগ্রহ আরো বারতে লাগল। চীনা মাটির পাত্র। রুপার তৈরি পানদানি, আরো অনেক কিছু। আর একজন বয়স্ক মানুষ দেখতে পেলাম ওনার সঙ্গে আলাপ করে। জানতে পারলাম উনি ডাক্তার ছায়মদ্দিন খান। বয়স প্রায় আশির কোঠায়। পরণে সাদা কাপড় মাথায় টুপি পরা। উনি আমাকে ওনার জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন। সেই ব্রিটিশ সরকার আমলের কথা, উনি এই শহশ্রাম ইউনিয়নের গ্রামের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বহুবছর ঘোড়া নিয়ে ছুটে চলতেন। কলকাতা শহরে দশ বছর থেকে দেশে ফিরে আসেন। তিনি সেখানে ইন্টারমিডিয়েট করে হোমিওপ্যাথি কলেজে ভর্তি হন এবং পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে আসেন। ব্রিটিশ সরকার আমলেই তিনি গ্রামের লোকজনের সেবা করতে থাকলেন। গ্রামে প্রাইমারি স্কুল, মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা নির্মাণে এগিয়ে যান। জায়গাটা ছিল হিন্দুপ্রধান এলাকা। মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা বেশ পিছিয়েপড়া ছিল। তাদের সমতা রক্ষায় তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু তখনো খুব মিলেমিশে থাকতো হিন্দু-মুসলিম।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১