আপডেট : ২৬ May ২০২১
গৌতম রায় বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাংলাদেশের দ্বিতীয় শিক্ষানীতি। বহুল প্রতীক্ষিত এই শিক্ষানীতি জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উক্ত শিক্ষানীতি অনুসারে পরিচালিত হবে এবং তা সার্বিকভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু দশ বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর শিক্ষানীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও কৌশল বাস্তবায়িত না হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। শুরুতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির আশাব্যঞ্জক হার ও জেন্ডার সমতা অর্জনের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এই ইতিবাচক অবস্থার বিপরীতে বাংলাদেশের শতভাগ সাক্ষরতার হার অর্জনের বিষয়টি ততোটাই হতাশাজনক। সরকারিভাবে বর্তমানে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৫ শতাংশ; তবে এ-নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশেরও কম। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির সময়ে এই চিত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও সাক্ষরতার হার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে একসময় ‘সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন’ নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিলো, কিন্তু সীমাহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। সাক্ষরতার হার বাড়ানোর নানা উদ্যোগের কথাসময়ে সময়ে শোনা গেলেও বড় আকারের কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি যার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই দেশের সাক্ষরতার হার বাড়াতে সক্ষম। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিরক্ষর রেখে টেকসই জাতীয় উন্নতি সম্ভবপর নয়। হতাশা রয়েছে উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়েও। বাংলাদেশে গত তিন দশকে প্রচুর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সেগুলোর মান নিয়ে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেরই প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া ও গবেষণার মান আশাহত করে। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হয় কোনো অবস্থান নেই, কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে দুয়েকটি থাকলেও সেগুলোর অবস্থান শেষের দিকে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের এগিয়ে নিতে পারছে না; তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল যে কাজ গবেষণা, সেখানেও অবস্থান চূড়ান্তভাবে হতাশাজনক। বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার মানের সাথে একদিকে যেমন বাজেট বরাদ্দের সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি রয়েছে গবেষণার সংস্কৃতি অভাবের দিকটিও। যে মান ও পরিমাণের গবেষণা করার কথা, তার ধারেকাছেও নেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ। পাশাপাশি, স্থানীয় চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে উদ্ভাবনের দিক দিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে পারছে না। সীমিত সম্পদ ও অর্থ দিয়ে যেটুকু হচ্ছে, তা থেকে ধারণা করা যায়, সক্ষমতার দিক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারে খারাপ অবস্থানে নেই; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যেভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন সেরকম কার্যকর নীতি ও দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। শিক্ষার উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, যা আশাব্যঞ্জক দিক। তবে এই একুশ শতকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের যে চিত্র দেখা যায়, তাতে একদিকে যেমন সম্পদের অভাব প্রকটভাবে ফুটে ওঠে, তেমনি শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তিকে একত্র করে ব্যবহারের দক্ষতা ও যোগ্যতার অভাবও পরিলক্ষিত হয়। করোনাকালে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরে বাংলাদেশের শিক্ষা যেভাবে চলেছে, তাতে শিক্ষার সাথে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের দিকটি নিয়ে হতাশ হতে হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে নীতির অভাব রয়েছে। রয়েছে ইন্টারনেট সুবিধা ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অপ্রতুলতাও। এসব কারণে করোনাকালে শিক্ষা-কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সফলতা আসেনি। অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হলেও নানা সীমাবদ্ধতায় তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হতে পারেনি। একটি দেশের ৫০ বছর অতিবাহিত হওয়া কম সময় নয়। এই হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষায় বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে। যেমন, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অন্যতম ফোকাস ছিল দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের বড় অংশ যায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। সবার জন্য উচ্চশিক্ষা প্রয়োজন রয়েছে কি না সেই বিতর্ককে পাশ কাটিয়েও বলা যায়, একটি দ্রুত বর্ধনশীল দেশ হিসেবে শুরু থেকেই বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের যে পরিমাণ জনশক্তি প্রয়োজন, তার মূল জোগান দিতে পারে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির জন্যও এই শিক্ষার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। বর্তমান শিক্ষানীতিতে বিষয়টির ওপর জোর দেওয়ায় এই হার কিছুটা বাড়লেও তা আশাব্যঞ্জক নয়। একইভাবে আক্ষেপ রয়েছে বাংলাদেশের সব এলাকার শিক্ষা সমভাবে এগিয়ে না যাওয়ায়। যদিও হাওর, চর, চা-বাগান বা পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত বলে প্রতীয়মান হয়নি। একইভাবে, বাংলাদেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্যও বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি প্রয়োজন। এ-ও বাস্তবতা যে, সম্পদের অভাব আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় দুর্বলতা। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে বিদ্যালয় ভবনসমূহ পাকা হলেও বিদ্যালয়গুলো নানাভাবে সম্পদের অভাবে ভুগছে। বিদ্যালয়গুলোতে যে পরিমাণ ভবন থাকার কথা, শিক্ষা উপকরণ থাকার কথা কিংবা শিক্ষণ-শিখন কার্যাবলি পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ উপাদান থাকার কথা, সেগুলোর অভাব রয়েছে। কাঠামোগত এসব সমস্যা ছাড়াও শিক্ষার ভিন্ন কিছু সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। যে বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক তা হচ্ছে, একদিনে যেমন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি শিক্ষা হয়ে যাচ্ছে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। শিক্ষা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো উপাদান নয়। সুতরাং শিক্ষাকে এমন পর্যায়ে নিতে হবে তা যেন সমাজের চাহিদা পূরণ করে সমাজকে নানাভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণও এ-প্রসঙ্গে একটি বড় আলোচনার ক্ষেত্র। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই অব্যাহত হারে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বাড়ছে। নৈতিকতার অভাব, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষা-প্রতিটি আসলে পরস্পর-সম্পর্কিত। যে কারণে বর্তমান সময়ে এসে শিক্ষার একটি বড় সংস্কার আবশ্যক হয়ে পড়েছে। শিক্ষা যেন শুধু ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম না হয়, সেই বিষয়টি এই সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। শিক্ষা-সংস্কারের একটি অন্যতম লক্ষ্য হবে শিক্ষার মান বৃদ্ধি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার বৃদ্ধি ও ঝরেপড়া উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সংশয় রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও একই কথা প্রযোজ্য। প্রতি বছর অব্যাহতভাবে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও মানের অবনমন লক্ষণীয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (এনএসএ)-এর বিভিন্ন তথ্য থেকে দেখা যায়, তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত যেসব প্রান্তিক যোগ্যতা রয়েছে, শিক্ষার্থীরা সেসব যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। একই ফলাফল দেখা গেছে এডুকেশন ওয়াচ পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায়ও। একদিনে পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে, অপরদিকে পাল্লা দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে শিক্ষার মানের বিষয়টি। শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন পরীক্ষানির্ভর হয়ে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও দীর্ঘদিনের। যে-বিষয়টি খুব উদ্বেগজনক সেটি হচ্ছে, শিক্ষা নিয়ে নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে এবং পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া। শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ক্ষতিকর হতে পারে। শিক্ষার ক্ষতি দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান উভয়ই। দৃশ্যমান ক্ষতি নানাভাবে পুষিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলেও অদৃশ্যমান ক্ষতির প্রভাব উপলব্ধি করতে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায় এবং ততোদিনে এর প্রভাব পড়ে অন্যান্য সেক্টরেও। সৃজনশীল শিক্ষার কথাই এখানে বলা যেতে পারে। শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রয়াস নিয়েই সৃজনশীল শিক্ষা শুরু হয়েছিল; কিন্তু এর জন্য প্রাসঙ্গিক যেসব উপাদানকেও প্রস্তুত থাকতে হতো, সেগুলোর অনুপস্থিতি ছিল প্রকট। বিশেষ করে, শিক্ষকরা এর জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। পর্যাপ্ত ও যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সৃজনশীল শিক্ষার নেতিবাচক দিকগুলো হয়তো প্রকট হতো না। শিক্ষকদের মান ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও শিক্ষার গুণগত মান অর্জনের সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে যেসব পেশা তুলনামূলকভাবে অবহেলিত, শিক্ষকতা তার একটি। প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির তালিকা করলে অপ্রাপ্তির তালিকাই হয়তো দীর্ঘ হবে; কিন্তু আশাবাদের বিষয় এই যে, বাংলাদেশ শিক্ষার যেসব বিষয়ে সাফল্য অর্জন করেছে, সেগুলো অর্জন করা সহজতর ছিল না। কঠিন বিষয়গুলো যেহেতু অর্জিত হয়েছে, সুতরাং শিক্ষার অন্য অনেক বিষয়ে পর্যাপ্ত ও আন্তরিক উদ্যোগের মাধ্যমেই সহজ অর্জন সম্ভব। রূপকল্প ২০৪১-কে সামনে রেখে বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে। শিক্ষানীতিতে পরিমার্জন করে এই অগ্রযাত্রায় শিক্ষাখাত যথাযথ গুরুত্ব পাবে, এটিই প্রত্যাশা। লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১