আপডেট : ১১ May ২০২১
নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের (এবিটি) সঙ্গে হেফাজত ইসলামের নেতাদের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হঠাৎ সরব হয়ে ওঠা আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও গ্রেপ্তার সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে। তবে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের প্রধান পলাতক আবু ইমরানকে গ্রেপ্তার করতে পারলে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। পলাতক এ নেতাকে গ্রেপ্তারে কাজ করছে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমের (সিটিটিসি) কয়েকটি টিম। আনসারুল্লাহর আধ্যাত্মিক নেতা জসিম উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। তার স্থলে প্রধান এখন আবু ইমরান। আর দলের প্রধান সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্তকৃত মেজর জিয়া অপারেশনাল কমান্ডার হিসেবে রয়েছেন। তাকেও গ্রেপ্তারে কাজ করছে র্যাব ও পুলিশের একাধিক টিম। সিটিটিসির উপ-পুলিশ কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, রাজবাড়ী থেকে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের নেতা আবু ওসমানকে গ্রেপ্তারের পর হেফাজতের সঙ্গে তাদের একটি যোগসূত্রের তথ্য পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে কাজ করা হচ্ছে। অপরদিকে সিটিটিসির প্রধান আসাদুজ্জামান বলেছেন, আনসারুল্লাহসহ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে হেফাজতে সম্পর্কের বিষয়ে মামুনুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ঝিমিয়ে পড়া নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) সরব হয়। অনলাইনভিত্তিক তাদের কার্যক্রমে আবারো তাদের অনুসারীদের টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের হত্যার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, এমনকি ট্রেনিং দিতে থাকে। একপর্যায়ে বিষয়টি নজরে আসে সিটিটিসির। সিটিটিসির সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে বদর দিবসে তলোয়ার হাতে জাতীয় সংসদে হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে জঙ্গি এ সংগঠনটির স্লিপার সেলের কয়েকজন সদস্য। এর পরপরই গ্রেপ্তারের জন্য ফাঁদ পাতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গত ৫ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানার জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সাকিবকে এবং সেদিন গভীর রাতে রাজবাড়ী সদর থানা এলাকা হতে আলী হাসান উসামাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় সাকিবের হেফাজত হতে ১টি কালো পতাকা, মাথায় বাঁধার জন্য ১টি কালো রুমাল, বড় ১টি ছোরা, ১টি মোবাইল ফোন ও আলী হাসানের হেফাজত হতে ১ টি ল্যাপটপ ও কিছু উগ্রবাদী বার্তাসংবলিত পুস্তক উদ্ধার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত আল সাকিব আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য। সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উগ্রবাদী বার্তাসংবলিত কতিপয় বক্তার ভিডিও চিত্র দেখে ৩১৩ জন সদস্য সংগ্রহ করে রমজান মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যর ওপরে হামলার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা সফল করার লক্ষ্যে সে কথিত বক্তাদের সাথে যোগাযোগ করেন। তাদের দেওয়া পরামর্শ মতে, অভিযুক্ত সাকিব সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে হামলার সদস্য সংগ্রহের জন্য একাধিক পোস্ট ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে দাওয়াত দেন। পরিকল্পনা মোতাবেক গত ৫ মে সন্ধ্যা সাড়ে৭ টায় টায় মানিক এভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির ওপর নাশকতা সংঘটনের প্রাককালে ধারালো অস্ত্রসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার হন সাকিব। সে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান অনার্সের ১ম বর্ষের ছাত্র। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, গ্রেপ্তার সাকিবের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজবাড়ী সদর থেকে উগ্রবাদী বক্তা আলী হাসান উসামাকে গ্রেফতার করা হয়। হাসান তথাকথিত জিহাদের নামে জঙ্গী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সমর্থনে বিভিন্ন ভিডিও তৈরি করে এবং তা ইউটিউবে প্রচার করে। সে সাকিবকে সংসদ ভবনের সামনে হামলার ব্যাপারে ইন্ধন দেয় ও উদ্বুদ্ধ করে। সে রাজবাড়ী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব ছিলেন বলে কাউন্টার টেরোরিজম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ সূত্রে জানা যায়। এদিকে গত ৮ মে আরো ৪ আনসারুল্লা বাংলাটিমের সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো-জসিমুল ইসলাম ওরফে জ্যাক, মো. আব্দুল মুকিত, আমিনুল হক ও সজীব ইখতিয়ার। গ্রেপ্তারের সময় তাদের হেফাজত হতে ১টি ব্যাগ, ১টি চাপাতি, ৫টি স্মার্ট ফোন ও ২টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। হেফাজত ও আনসারুল্লাহ যোগসূত্র : রাজবাড়ী সদর থানা এলাকা হতে আলী হাসান উসামা ও চট্টগ্রামে আটক হেফাজত নেতার সঙ্গে যোগসূত্র পায় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। উসামা রাজবাড়ীতে একটি মাদরাসা তৈরি করেন। সেই মাদরাসার কাগজপত্র জব্দের পর দেখা যায় মাদরাসাটির পরিচালনা বোর্ডের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন হারুন ইজহার। হারুন ইজহারের উগ্রবাদী বক্তব্য ও উসামার বক্তব্যেরও মিল পাওয়া যায়। এখান থেকে অনেকটা বোঝা যায় হেফাজতের কতিপয় নেতার সঙ্গে আনসারুল্লাহ যোগসূত্র রয়েছে। কাউন্টার টেরোরিজমের উপ-পুলিশ কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা রিমান্ডে রয়েছে। রিমান্ডে আরো কিছু তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো যাছাই বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আবু উসামার সঙ্গে হারুনের ইজহারের কি সম্পর্ক পাশাপাশি আবু ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ সবমিলিয়ে আমরা তাদের কাছ থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করছি। যেহেতু উসামার মাদরাসার প্রধান উপদেষ্টা হারুন ইজাহার সুতরাং এদের মধ্যে আদর্শিক মিল থাকাটাই স্বাভাবিক। কাউন্টার টেরোরিজমের প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের একাধিক অফিসার আনসারুল্লাহর সঙ্গে হেফাজতের কিছু নেতার সঙ্গে যোগসূত্র পাচ্ছেন। এটি আরো পরিষ্কার হওয়ার জন্য ও অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য আমরা মামুনুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এদিকে সিটিটিসির সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজতের তাণ্ডবের সময় আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্যরাও যোগ দিয়েছিল। তাদের আক্রমণের ধরন এমনটাই জানান দিচ্ছে। আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আনসারুল্লাহ প্রধান আবু ইমরানকে গ্রেপ্তার করা গেলে এ বিষয়ে আরো পরিষ্কার হওয়া যাবে। সূত্র আরো জানায়, ইতোমধ্যে আবু ইমরানকে গ্রেপ্তারের জন্য কয়েকটি স্থানে অভিযানও পরিচলনা করা হয়েছে; কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। একনজরে আনসারুল্লাহ বাংলাটিম : আনসারুল্লাহ বাংলা টিম একটি সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন। সংগঠনটি ২০১৩ সাল থেকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। বাংলাদেশের যুবকদের উগ্রপন্থি আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে জিহাদের মাধ্যমে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য। সংগঠনটি তাদের মতাদর্শ প্রচারের জন্য মসজিদকেও ব্যবহার করে থাকে। সংগঠনটির হামলার মূল লক্ষ্য হলো মুক্ত চিন্তার অনুসারী, ব্লগার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০১৩ সালের ১২ আগস্ট বরগুনা জেলার একটি মসজিদে জঙ্গি হামলা ও নাশকতার পরিকল্পনা করার সময় সংগঠনটির নেতা মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীসহ ৩০ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারা ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যা করে। এ হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, যারা পরে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে এবং ৭ মার্চ সানিউর রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তারা মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীর ওপর হামলা চালায়। এতে অভিজিৎ রায় নিহত ও তার স্ত্রী গুরুতর জখম হয়। গত ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াসিকুর রহমানকে একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালের ২৫ মে জঙ্গি এ সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৫ বছরেও ধরা পড়েনি জিয়া : তার পুরো নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। সংক্ষেপে মেজর জিয়া। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ জিল্লুল হক। গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে। সর্বশেষ তিনি মিরপুর সেনানিবাসে থাকতেন। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনা সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করা হয়। অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই মেজর জিয়া। বর্তমানে মেজর জিয়া দেশের মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। জঙ্গি তৎপরতায় যোগ দিয়ে হয়ে গেছেন অন্যতম নেতা। নব্য জেএমবি থেকে শুরু করে এবিটি পর্যন্ত সকল জঙ্গি গ্রুপের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন এই মেজর জিয়া। গত ১৫ বছরে তার নির্দেশনায় দেশি-বিদেশি নাগরিক, ইমাম, পুরোহিত, সুশীল সমাজের লোকজন এবং ব্লগারসহ প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির প্রাণ নিয়েছেন জঙ্গিরা। এসব খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় ১২০০ জঙ্গি গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বেশিরভাগই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক রয়েছেন। কিন্তু জঙ্গিদের নেতা মেজর জিয়ার খোঁজ কেউ দিতে পারছেন না। র্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন অভিযান চালিয়েও ১৫ বছরেও তার হদিশ মেলেনি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১