বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৪ April ২০২১

পুরান ঢাকার আতঙ্ক আগুন


বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আগুন পিছু ছাড়ছে না পুরান ঢাকাবাসীদের। একের পর এক আগুনের ঘটনার পর প্রশাসন আশ্বাস দেওয়ার পরও এই এলাকা থেকে সরেনি কেমিক্যালে গোডাউনসহ দাহ্য পদার্থের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তাই হরহামেশাই আগুনে পুড়ে মৃত্যুপুরিতে পরিণত হচ্ছে পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থান। আর মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই প্রতিনিয়ত চলতে হচ্ছে এই এলাকার বাসিন্দাদের। যার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটলো আরমানিটোলায়।

ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টা ১৮ মিনিটে আরমানিটোলার আরমানিয়ান স্ট্রিটের হাজী মুসা ম্যানসনে আগুন লাগে। আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৪ জন। এর মধ্যে রয়েছেন, ইডেন কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী সুমাইয়া, মার্কেটের গার্ড রাসেল ও ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী ওলিউল্লাহ ব্যাপারী। অপরজনের পরিচয় জানা যায়নি। ভবনটির আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস ১৯টি ইউনিট কাজ করে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন লাগার পর ভবনের ছাদে আটকাপড়া লোকজনকে উদ্ধারে ল্যাডার ইউনিট যুক্ত করা হয়েছিল। ভবনটির দোতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত লোকজন বসবাস করলেও এর নিচতলায় ছিল কেমিক্যালের গোডাউন। এ ঘটনায় আহত ২১ জন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আছেন। এরমধ্যে চারজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, পুরান ঢাকা থেকে যতদিন পর্যন্ত কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তর করা না হবে ততদিন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে। গত ২৫ বছর ধরে পুরান ঢাকা থেকে  কেমিক্যালের গোডাউন ও কারখানা সরানোর দাবি করে আসছেন সেখানকার বাসিন্দারা। তবে একশ্রেণির লোভী বাড়িওয়ালা ও ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে এতদিনেও পূরণ হয়নি সেই দাবি-এমনটাই মনে করছেন এলাকাবাসী। এরইমধ্যে গত ২৫ বছরে পুরান ঢাকায় কমপক্ষে ৪টি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন ২২০ জন। পুরান ঢাকার প্রথম বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৬ সালে। ওই বছর চকবাজারের হায়দার বক্স লেনে কেমিক্যাল থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে ১৮ জন নিহত হন। তখন থেকেই কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর দাবি করে আসছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের। এরপর ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা যান ১২৪ জন। কেমিক্যালের গুদামের কারণে ওই আগুনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বাড়ে হতাহতের সংখ্যা। ওই আগুনের পর ৮০০ রাসায়নিক গুদাম, কারাখানার তালিকা করা হয়। উদ্যোগ নেওয়া হয় তা সরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের চুরিহাট্টার রাজ্জাক ভবনের কেমিক্যাল গুদামে আগুন লেগে মারা যায় ৭১ জন, আহত হন ৪১ জন। এরপর আবারো উচ্চারিত হয় পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার দাবি। আবারো নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। কিন্তু কিছুদিন পর থেমে যায় সেই উদ্যোগও। ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপ-পরিচালক সেলিম নেওয়াজ ভূইয়া বলেন, নিমতলীর, চকবাজার কিংবা আরমানিটোলার ঘটনার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কেমিকেল গুদাম আর কসমেটিকস কারখানার দাহ্য পদার্থের কারণেই এসব এলাকার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

সাবেক এই ফায়ার ফাইটার বলেন, এরকম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কোনো দাহ্য পদার্থের কারখানা থাকতে পারে না। এসব কারখানার কেমিকেলের ড্রামের ওপরই থাকে বিদ্যুৎ সংযোগ। নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। এসব এলাকার অবস্থা খুবই ভয়াবহ।

নিমতলীর অগ্নিনির্বাপনে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা নিমতলীর ঘটনার পর ৮০০ কেমিকেল কারখানা চিহ্নিত করে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু পরে আর তা সরানো হয়নি। সরকার বলেছিল পর্যায়ক্রমে সরাবে। কিন্তু হয়নি। আমরাতো প্রতিবেদন দিয়েছি। আমাদের ওপরে অনেক বড় কর্তারা আছেন। তারাই বলতে পারবেন কেন সরানো হয়নি।

ডিএসসিসির ভূমিকা : এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জানান, গত দুই বছর ধরে পুরান ঢাকার কোনো কেমিকেল কারখানা বা গোডাউনের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া  আগে যারা লাইসেন্স নিয়েছেন তাদের নবায়নও বন্ধ আছে।

বাড়িওয়ালা আর ব্যবসায়ীরাই প্রতিবন্ধক : নিমতলীর ও চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরও তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি পুরান ঢাকার। চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও পলিথিনের গুদাম এবং কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে অভিযানের  ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়েন তারা। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল-প্লাস্টিক থেকে আগুন লাগে না, ছড়ায়ও না। এমন দাবির পর প্লাস্টিককে অভিযানের আওতামুক্ত ঘোষণা করেন তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। পরে ৩৫টি রাসায়নিক গুদামের মালিককে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৬২টি রাসায়নিক ও প্লাস্টিকের কাঁচামালের গুদামের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ২৭টি রাসায়নিক গুদামে সিলগালা করা হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান রাসায়নিক ও প্লাস্টিকের গুদাম সরিয়ে নিলেও বাকিগুলো আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, প্রায় দুই হাজার অবৈধ কেমিকেল কারখানা ও গোডাউনের তালিকা তৈরি করে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে জমা দিয়েছি। ওই কেমিকেল কারখানাগুলো শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরানোর কথা। নানা জটিলতার কারণে এতদিনেও সেগুলো সরানো যায়নি। 

ডিএসসিসির এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, পুরান ঢাকা থেকে কেমিকেল কারখানা বা গোডাউনগুলো সরিয়ে  কেমিকেল পল্লী করার জন্য আমার গাজীপুর ও মুন্সীগঞ্জে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছি। এর সাথে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ও জড়িত আছে। তবে জমি অধিগ্রহণের কাজ এত সহজ নয়। তারপরও আমরা শিল্প মন্ত্রণালয় ও এফবিসিসিআইর সঙ্গে বৈঠক করে দ্রুত কাজ করার তাগিদ দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, ওখানকার (পুরান ঢাকা) বাড়ির মালিকরা কেমিকেল কারখানার জন্য ভাড়া দিলে বেশি ভাড়া পায়। সেই লোভেই পুরনো ঢাকায় কেমিকেল কারখানা না কমে বরং বেড়েই চলেছে। তবে ওইসব অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে নিযমিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিসিক কেমিকেল পল্লী : নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিটির বিশেষজ্ঞরা যে ১৭টি সুপারিশ পেশ করেছিলেন, সেগুলোর প্রথমেই ছিল বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের গুদাম ও কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়া। ওইসব সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের। ওই সুপারিশের ৮ বছর পর ২০১৮ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় ‘বিসিক কেমিকেল পল্লী’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ২০২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। তবে চলমান প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে। ৫০ একর জমিতে চার হাজার কেমিকেল গোডাউন স্থানান্তরের কথা ছিল। তবে প্রকল্পের আওতায় জমি পাওয়া যায়নি। চার হাজার কেমিকেল গোডাউন স্থানান্তরের কথা থাকলেও আরো পাঁচ হাজার গোডাউন স্থানান্তর করা হবে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর একটি সূত্র জানায়, শুধু পুরান ঢাকা নয়, মানিকগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৯ হাজার কেমিকেল গোডাউন রয়েছে। এসব কেমিকেল গোডাউন স্থানান্তরে ২৫০ একর জমির প্রয়োজন। মাত্র ৫০ একর জমিতে হবে না।

বাংলাদেশ এসিড মার্চেন্ট এসেসিয়েশনের সভাপিত মোহাম্মদ উল্লাহ পলাশ বলেন, যত দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে, তত দ্রুত তারা এই এলাকা ছেড়ে যাবেন। তার দাবি, যে ২৯টি কেমিকেল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলো পুরান ঢাকায় এখন আর নেই। তবে অবৈধভাবে কেউ তা কেনাবেচা করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১