আপডেট : ১৫ February ২০২১
বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার নামে রাজধানীতে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র। হাতের কারসাজিতে টাকা সরিয়ে ফেলা কিংবা জাল ডলার দিয়ে চক্রটি প্রতারিত করছে সাধারণ মানুষকে। মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে এদের উৎপাত। ভুক্তভোগীদের কেউ অভিযোগ না করায় প্রতারণার এসব ঘটনাও রয়ে যাচ্ছে আড়ালে। বিদেশ যেতে সবারই ডলারের প্রয়োজন হয়। আর বিদেশগামীরা সাধারণত ব্যাংক কিংবা মানি এক্সচেঞ্জ থেকে তা সংগ্রহ করেন। কিন্তু এর বাইরেও কেউ কেউ ভ্রাম্যমাণ অবৈধ ডলার বিক্রেতাদের কাছ থেকে ডলার কেনাবেচা করেন। আর সেখানেই ঘটে বিপত্তি। মতিঝিল-দিলকুশা ব্যাংকপাড়া, বিশেষ করে বক চত্বর, মার্কেন্টাইল প্রধান শাখাসংলগ্ন রাস্তায় হাতে দেশি-বিদেশি মুদ্রা নিয়ে প্রকাশ্য ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় এসব অবৈধ মুদ্র বিক্রেতাদের। তারা ওত পেতে থাকে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়কারী ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জগুলোর আশপাশে। এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কেনা-বেচা চক্রের সাথে লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে আসা মানুষদের তারা কম মূল্যে এবং বিক্রি করতে আসা মানুষদের তারা বেশি বিনিময় হার প্রস্তাব করে। বিদেশ ফেরত অনেকেই বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসেন। এ ধরনের মানুষ ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জের তুলনায় বেশি বিনিময় মূল্য পাওয়ার লোভে প্রতারকদের ফাঁদে পা ফেলে প্রতারিত হচ্ছেন। হাতের কারসাজিতে তারা সরিয়ে ফেলে টাকা। প্রতারিত ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বুঝতেও পারে না। মুদ্রা ভাঙিয়ে বাসায় গিয়ে টাকা গোনার পর প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না। আবার বিদেশ যাওয়ার জন্য বৈধভাবে ডলার এনডোর্সমেন্ট করার পরও অনেকেরই প্রয়োজন পড়ে বাড়তি ডলারের। এরকম ব্যক্তিরাও এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ ডলার বিক্রেতাদের কাছ থেকে ডলার কেনেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে দেশি জাল টাকা চেনা কখনো কখনো সম্ভব হলেও অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই বিদেশি জাল নোট চেনা সম্ভব না। এই সুযোগটিই নিচ্ছে প্রতারক চক্রটি। তারা আসল বৈদেশিক মুদ্রার সাথে নকল মুদ্রা দিয়ে দেয়। বিদেশ যাওয়ার পর তারা বুঝতে পারেন প্রতারণার বিষয়টি। কিন্তু তখন আর কিছুই করার থাকে না। হাতের কারসাজি বিদেশ ফেরত সাধারণ মানুষ ওই এলাকায় বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙাতে ব্যাংকে প্রবেশের আগেই তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায় চক্রের সদস্যরা। দেওয়া হয় ব্যাংক রেটের চেয়েও অধিক বিনিময় প্রস্তাব। অনেকে তাদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে পা দেয় তাদের প্রলোভনে। প্রতারকচক্রের প্রস্তাবে সাড়া দিতেই চক্রের একাধিক সদস্য ঘিরে ধরে ওই ব্যক্তিকে। তারা মুদ্রা ভাঙাতে আসা ব্যক্তির কাছে প্রথমে জানতে চায় তিনি কোন দেশের কত টাকা ভাঙাবেন। এরপর ক্যালকুলেটরে হিসেব করে বাংলাদেশি টাকা হস্তান্তর করে ওই ব্যক্তির কাছে। বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য তারা আগেই ওই ব্যক্তির কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ করে না। মুদ্রা ভাঙাতে আসা ব্যক্তির হাতে বাংলাদেশি টাকা দেওয়ার পর তাকে বলা হয়-‘আপনি টাকা গুনে দেখেন ঠিক আছে কি না।’ টাকা গুনে ঠিক আছে বলার পর চক্রের আরেক সদস্য ‘দেন আবারো গুনে দেই’ বলে তার হাত থেকে টাকা নিয়ে নেয়। আর তখনই কৌশলে বেশ কিছু টাকা সরিয়ে ফেলে তারা। চক্রের সদস্যরা ওই ব্যক্তির সামনে এমনভাবে টাকা গুনে দেখাবে যে তিনি দেখবেন টাকা ঠিকই আছে। ‘টাকা ঠিক আছে’ বলার পর টাকা হস্তান্তর করা হয়। এরপর তার কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করে চক্রের সদস্যরা। সম্প্রতি র্যাব-৩-এর কাছে এরকম একটি অভিযোগ আসে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিকে র্যাব অভিযান চালায় মতিঝিলের দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রধান শাখার সামনের রাস্তায়। দেশি-বিদেশি জাল মুদ্রাসহ আটক করা হয় ৪ জনকে। তাদের কাছ থেকে ১০টি জাল ইউএস ১০০ ডলার, বাংলাদেশি এক হাজার টাকার জাল নোট ১০টি, ব্রিটিশ জাল নোট ৫ পাউন্ড ১০টি, ৫ ইউরো জাল নোট ২০টি ও ওমানের দশটি জাল উদ্ধার করা হয়। র্যাব-৩-এর উপ পরিদর্শক আবু নোমান বলেন, বিদেশগামী অনেকের খুচরা বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। প্রথমে তাদের টার্গেট করে চক্রের কোনো সদস্য। পরে ওই ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয় চক্রের অন্য সদস্যের কাছে। টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে বলা হয়, তারা এসব বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের কাছ থেকে। তাদের কথায় বিশ্বাস করে বিদেশগামীরা বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে। কিন্তু বিদেশ গিয়ে ওইসব মুদ্রা ব্যবহার করতে গিয়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হন তারা। দিলকুশাকেন্দ্রিক জাল মুদ্রা বিক্রি চক্রের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন। জাল বৈদেশিক মুদ্রার উৎসস্থল সম্পর্কে তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি। শুধু মতিঝিলই নয় রাজধানীর অভিজাত এলাকাতেও চলছে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির নামে প্রতারণা। সম্প্রতি সিআইডি’র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে মহাখালী থেকে সেন্টু মুন্সি ও দেলোয়ার মোল্লা নামে এরকম দুই প্রতারককে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সজাগ দৃষ্টি আছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। ব্যাংক কিংবা সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া এ ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা কেনা-বেচা করাটা সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পন্থায় এ ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা কেনা-বেচা থেকে সবাইকে বিরত থাকার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১