বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৩ December ২০২০

ভার্চুয়াল জুয়ায় বাড়ছে আসক্তি


‘ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যাই, ক্লাস থেকে এসে ঘুমাই। রাতের বেলা দান মারি, কখনো দিনেও দান মারতে হয়, তখন ক্যাম্পাসে যাই না। আরামের জীবন। বেশি খাটুনি আমার সয় না। অল্প খাটবো বেশি কামাবো। ভার্সিটির সব খরচ তো আমি নিজেই দিই। আবার বাসাতেও প্রতিমাসে মেলা টাকা পাঠাই।’

বলছিলেন রাজধানীর একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকবর্ষের ছাত্র ফাহিম (ছদ্মনাম)। একটু খোলাসা করে বললে বিষয়টি দাঁড়ায় ফাহিম একজন জুয়াড়ি। তবে এই জুয়া খেলার জন্য কোনো ক্লাবে যেতে হয় না তাকে। ঘরে বসে অনলাইনে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই অনায়াসে খেলা যায়।

অনলাইনভিত্তিক এই জুয়ায় সবাই কি তার মতো লাভবান হয় কি-না এমন প্রশ্নে হেসে দিয়ে ফাহিম বলেন, ‘এই খেলায় বড় কপাল লাগে, যেনতেন কেউ এই খেলায় জিততে পারে না। ঐ যে সোহাগ-পরাগ দুই ভাই আছে না? এরাও খেলছে। বাড়ি থেকে সেমিস্টারের জন্য টাকা এনে এনে একের পর এক হেরেই গেছে। এখন সেমিস্টার ড্রপ দিয়ে বাড়ি চলে গেছে।’

ক্যাসিনোর মতোই ভয়ংকর নেশা ‘অনলাইনভিত্তিক জুয়া’। অনলাইনভিত্তিক এই ভার্চুয়াল জুয়ায় দিন দিন আসক্ত হয়ে পড়ছেন সববয়সী মানুষ। তবে বেশিরভাগই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বহুদিন ধরে অনলাইনেও চলে আসছে জুয়ার রমরমা ব্যবসা। এ অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযানও পরিচালনা করে। গ্রেপ্তারও হয়। তারপরও থেমে নেই জুয়া। গত শুক্রবারও এন্টি টেরোরিজম ইউনিট রাজধানীর অদূরে সাভার থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। এরা অনলাইন জুয়ার পেজের অ্যাডমিন। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের বাইরে থেকেই পরিচালিত হয় এসব জুয়ার সাইট। তবে বাংলাদেশে রয়েছে তাদের কয়েকশ ডিলার। বিভিন্ন ধরনের জুয়া খেলার পাশাপাশি আছে বেটিং (বাজি) ব্যবস্থাও। সেগুলোকে আলাদাভাবে বেটিং সাইট নামে ডাকা হয়। এছাড়া লটারি ধরাও জুয়াড়িদের কাছে বেশ প্রিয়। ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিবন্ধিত হওয়া জুয়া ও বেটিং সাইটগুলোই বেশি পরিচিত দেশের জুয়াড়িদের কাছে।

খেলায় কীভাবে অংশগ্রহণ করেন জুয়াড়িরা?

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের শিলং থেকে পরিচালিত ‘তীর কাউন্টার ডট কম’ এবং ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ অনলাইন জুয়ার আসরের নাম বেশি শোনা যায়। এরমধ্যে তীর কাউন্টার সিলেট অঞ্চলের জুয়াড়িদের মধ্যে বহুল ব্যবহূত। আর তিন পাত্তি গোল্ড মোটামুটি পুরো দেশ থেকেই কমবেশি খেলা হয়। আর বেটিং সাইট হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ‘বেট৩৬৫’।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিন পাত্তি গোল্ড একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ। এটি গুগল প্লে স্টোরে পাওয়া যায় অথবা গুগলে সার্চ দিলে এই গেম ডাউনলোডের জন্য অনেক সাইট চলে আসে। এই সফটওয়্যারটি ৫০ মিলিয়নের বেশি মানুষ ডাউনলোড করেছে। প্রতিদিন ভার্চুয়াল বোর্ডে লেনদেন হয় কোটি কোটি চিপস (জুয়ার কয়েন)। বাংলাদেশে রয়েছে তিন পাত্তি গোল্ডের চিপসের কয়েকশ’ ডিলার। এরা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেজ খুলে চিপস বিক্রি করছে। এই গেমটি খেলতে হলে ইন্টারনেট কানেকশন যুক্ত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ও একটি ফেসবুক আইডির প্রয়োজন হয়।

অনলাইনে যারা চিপস কিনেছেন-এমন কয়েকজন জুয়াড়ির সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপ হয়। তাদের ফোন নম্বর চিপস বিক্রেতা ডিলারদের পেজের ‘কমেন্টবক্স’ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু কোনো জুয়াড়িই তাদের নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি। তাদের একজন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র। তিনি বলেন, ‘বছর তিনেক আগে এক বান্ধবীর সহায়তায় এই খেলায় নামি। হোস্টেল আর হাত খরচের জন্য আব্বা বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতো বিকাশে। একাউন্টে যতক্ষণ টাকা থাকতো ততক্ষণ খেলতাম। প্রথমদিকে দু-একবার জিততাম কিন্তু পরে শুধু হেরেই গেছি। হারানো টাকা উসুল করার জন্য খেলতে থাকলাম। একাউন্টের টাকা শেষ হওয়ার পর বন্ধু-বান্ধবদের থেকে বিশাল অংকের ধার নিয়ে বসলাম। ভালো অংকের টাকা জিতে গেলে সবার ধার পরিশোধ করতে পারবো, সেই মানসিকতায় পাগলের মতো খেলতে থাকলাম। কিন্তু লাভের মুখ আর দেখিনি।’

‘এখনো খেলি। নেশা খুব খারাপ জিনিস। তাই ছাড়তে পারি নাই।’ বলেন তিনি।

তিন পাত্তির আরেক জুয়াড়ি জানিয়েছেন, তিন পাত্তি গোল্ড হচ্ছে ৩টি তাসের খেলা। খেলার সবচেয়ে বড় কার্ড হলো তিন টেক্কা আর সবনি কার্ড ২-৩-৫। আর এ গেমের মূল বস্তুটি হচ্ছে চিপস বা কয়েন।

দেশের মধ্যে কারা এই ডিলার?

এসব জুয়ার সাইটে জুয়াড়িরা অনলাইনেই নিবন্ধন করেন। জুয়ায় অংশ নিতে মূল্য পরিশোধ করা যায় ক্রেডিট কার্ডে। যাদের ক্রেডিট কার্ড নেই অথবা যেসব সাইটে বাংলাদেশ থেকে নিবন্ধন করা যায় না সেখানেও আছে বিকল্প ব্যবস্থা। জুয়ার সাইটগুলোর জন্য ‘এজেন্ট’ হয়ে কাজ করে একদল লোক। তারাই ভিন্ন দেশ থেকে অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া এবং টাকা পরিশোধের কাজ করে দেন।

পাবেল নামের এক চিপস ডিলারের সঙ্গে ব্যবসায়ী সেজে কথা হলে তিন পাত্তির চিপসের রেট জানতে চাইলে তিনি ইমো নম্বরে কথা বলতে বলেন।

তার ইমোতে কল দেওয়ার আগেই তিনি ইমুতে একটি তালিকা পাঠান। চিপসের মূল্য তালিকায় উল্লেখ আছে এক কোটি চিপস ৭৫ টাকা, ২ কোটি ১৫০ টাকা, ৩ কোটি ২২৫ টাকা, ৪ কোটি ৩০০ টাকা, ৫ কোটি ৩৭৫ টাকা, ১০ কোটি ৭১০ টাকা, ১৪ কোটি ১ হাজার টাকা, ২০ কোটি ১৪২০ টাকা, ৩০ কোটি ২১০০ টাকা আর ৫০ কোটি ৩৫০০ টাকা।

অর্থপাচার ও ঝুঁকিতে ব্যক্তিগত তথ্য

জুয়াড়ি শুধু বাংলাদেশ থেকে অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করেন। আর ‘হার্ড ক্যাশ’ দেশের বাইরে চলে যায় হুন্ডির মাধ্যমে। তবে কেউ জুয়ায় জিতে গেল সেই অর্থ কীভাবে দেশে আসে সেটি এখনও পরিষ্কার নয় সংশ্লিষ্টদের কাছে। অনলাইন জুয়ায় যারা খেলে তাদের অনেককে ক্রেডিট কার্ড তথ্য দিতে হয়। যা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এমনকী জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘যারা জুয়া খেলেন, তারা লোভে পড়ে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। জুয়া সাইটে খেলতে হলে, অনেক সময় দেখা যায়, সাইট থেকে কম্পিউটারে কুকিজ ডাউনলোড হয়। অথবা মোবাইলে খেললে বিভিন্ন ধরনের পারমিশন চায়। সেই কুকিজ ডাউনলোড কিংবা পারমিশন দেওয়ার ফলে, মোবাইল বা ল্যাপটপ থেকে সংবেদনশীল তথ্য ওই পক্ষের কাছে চলে যেতে পারে।’

নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

জুয়ায় অংশগ্রহণ অনলাইনে হয় বলে এমন জুয়া নিয়ন্ত্রণে আনাও বেশ কষ্টসাধ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য। চলতি বছরের শুরুতে জুয়ার ১৭৬টি সাইটের গেটওয়ে বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)।

বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোঃ জাকির হোসেন খান বলেন, রাষ্ট্র বা জনগণের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলোর মতো অনলাইনে জুয়া বা বিটের সাইটগুলোর বিষয়েও সজাগ রয়েছে কমিশন। যেগুলোর মাধ্যমে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেগুলো বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাশাপাশি বর্তমানে নাম উঠে আসা সাইটগুলোর প্রতি নজর রাখছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ক্রাইমের ইউনিট।

র্যাবের মুখপাত্র লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, র্যাবের অনুসন্ধানে এ ধরনের নানা চক্রের তথ্য উঠে এসেছে। যারা অনলাইনে এরকম ব্যাটিং করছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। তারা বিকাশ এবং রকেট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। তারা খুব দ্রুত তাদের ঠিকানা পরিবর্তন করছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অনুসন্ধানে দেখেছি ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে সিমগুলো নিয়ে নেওয়া। র্যাবের নজরদারি ও গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত আছে।

ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, জুয়া বা বেটিং সাইটগুলোর দিকে আমাদের নজর আছে। আগেও আমরা এ নিয়ে কাজ করেছিলাম এবং বেশ সফলভাবে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম। এখন যেগুলোর নাম আসছে বিশেষ করে তিন পাত্তি গোল্ড, এগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি।

‘অনলাইনে জুয়া প্রতিরোধ বিষয়ে আমরা তৎপর রয়েছি। এর আগেও ক্রিকেট খেলা নিয়ে যেসব সাইটে জুয়া হতো সেগুলো আমরা বন্ধ করেছি। একটা বন্ধ করা হলে আরেকটি তারা খুলে ফেলে। এটা নিয়মিত মনিটরিং করা দরকার, আমরা মনিটরিং করছিও’- বলেন এই কর্মকর্তা।

ক্যাসিনোর মতোই ভয়ংকর নেশা ‘অনলাইনভিত্তিক জুয়া’। অনলাইনভিত্তিক এই ভার্চুয়াল জুয়ায় দিন দিন আসক্ত হয়ে পড়ছেন সববয়সী মানুষ। তবে বেশিরভাগই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করলে হবে না, পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। কারণ, যারা এ জুয়া খেলেন তারা বাসায় বসেই খেলেন। এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি বলে অনেকেই মনে করেন। 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১