আপডেট : ০৩ December ২০২০
রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে শিগগিরই ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সম্ভাবনাবিষয়ক কিছু প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে অথবা শরণার্থীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। স্থানান্তরের সার্বিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জাতিসংঘের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই বলে গতকাল বুধবার সংস্থাটির ঢাকা অফিস থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ভাসানচর পাঠাতে জাতিসংঘের কারিগরি কমিটির মূল্যায়নের পর এ বিষয়ে তারা মতামত জানাবে। প্রক্রিয়াটি অবশ্যই নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় হতে হবে। প্রথম দলকে সেখানে নেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়, স্থানান্তরের বিষয়ে রোহিঙ্গারা যেন প্রাসঙ্গিক, নির্ভুল এবং হালনাগাদ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বরাবরই আহ্বান জানিয়ে এসেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতেও জাতিসংঘ এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে। ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে যে, ওই দ্বীপে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর হবে স্বেচ্ছামূলক। জাতিসংঘ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য সরকারকে আহ্বান জানায়। ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবিকার নিশ্চয়তা বিধানের পাশাপাশি দ্বীপ থেকে মূল ভূখণ্ডে চলাচলের স্বাধীনতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে বিবৃতিতে। যে সব রোহিঙ্গা ভাসানচরে স্বেচ্ছায় স্থানান্তরিত হতে চাইবেন, ওই দ্বীপে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবিকার নিশ্চয়তা এবং দ্বীপ থেকে মূল ভূ-খণ্ডে চলাচলের স্বাধীনতাসহ সকল মৌলিক অধিকার এবং মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এটি ভাসানচরে একটি কার্যক্ষম ও নিরাপদ জনপদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ সরকার ভাসানচর প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে এ পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত, পদ্ধতিগত এবং বাস্তবায়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো বিবেচনার জন্য গঠনমূলক আলোচনার প্রস্তাব রেখেছে জাতিসংঘ। এ আলোচনা চালিয়ে যেতে জাতিসংঘ এখনো আগ্রহী। ভাসানচরে স্থানান্তর বিষয়ে আগে থেকে টেকনিক্যাল প্রোটেকশন এসেসমেন্ট করার প্রস্তাবও দিয়ে আসছে জাতিসংঘ। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, জাতিসংঘের এ নিরপেক্ষ মূল্যায়নে রোহিঙ্গাদের বাসস্থান হিসেবে ভাসানচরের নিরাপত্তা, প্রায়োগিক সম্ভাব্যতা, স্থায়িত্ব এবং শরণার্থীদের সুরক্ষা কাঠামো এবং তাদের সহায়তা ও সেবা গ্রহণের অবকাঠামোর সার্বিক পর্যালোচনা করা হবে। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে, জাতিসংঘ প্রায়োগিক এবং সুরক্ষা বিষয়ক মূল্যায়ন করার জন্য প্রস্তুত। জাতিসংঘ সরকারের ভাসানচর প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত হতে পারবে কি না, সেটা নির্ধারণে এ মূল্যায়নগুলো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এদিকে ইইউ বলেছে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচর পাঠাতে জাতিসংঘের কারিগরি কমিটির মূল্যায়নের পর এ বিষয়ে মতামত জানাবে তারা। গতকাল বুধবার রাজধানীর হোটেল লেকশোরে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনেসে তিরিঙ্ক। ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ-ডিকাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ‘ডিকাব টক’ আয়োজন করে। রেনেসে বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে প্রত্যাবাসন বিষয়ে জাতিসংঘের কারিগরি দল যে রিপোর্ট দেবে, সেটির জন্য অপেক্ষা করছি। তাদের রিপোর্টের পর আমাদের মতামত জানাব। তবে এ প্রক্রিয়াটি অবশ্যই নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় হতে হবে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনে কাজ করতে হবে সবাইকে। প্রত্যাবসন শুরু করতে আমরা কাজ করছি। মিয়ানমারের নির্বাচনের পর কি হয় সেটা আমরা দেখছি। ইইউর একক ভূমিক না দেখে পুরো বিশ্ব কি করছে সেটা দেখতে হবে। চীন, ভারত, আসিয়ানকে ভূমিকা রাখতে হবে। নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত হ্যারি ভারওয়ে বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন। তবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে সবাইকে সক্রিয় হতে হবে। এ আলোচনায় অংশ নেন ঢাকায় নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিস্কো ডি অ্যাসেস বেনেতেজ সালাস, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি স্ট্রাপ পিটারসন, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত হ্যারি ভারওয়াজ, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নানজিয়াতা, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেক্সন্দ্রা বার্গ ভন লিন্ডে। এতে আরো বক্তব্য রাখেন ডিকাবের প্রেসিডেন্ট আঙ্গুর নাহার মন্টি ও সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান। প্রসঙ্গত, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও তার বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে তাদের একটি অংশকে হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার। তবে সাগরের ভেতরে জনমানবহীন ওই চরে আশ্রয় নিতে রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণে এতদিন তাদের সেখানে স্থানান্তর সম্ভব হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের প্রথম দলকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার কথা ইতোমধ্যে জানিয়েছে সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হওয়ার কথা জানিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছুদ্দৌজা গত সোমবার বলেছিলেন, আগামী ৭-১০ দিনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের একটি দলকে ভাসানচরে স্থানান্তরের যাবতীয় প্রস্তুতি চলছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে মোটামুটি ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে ইতোমধ্যে ভাসানচরে নিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধিদলকে দেখার জন্য ভাসানচরে পাঠানো হয়। তারা ফেরার পর তাদের কথা শুনে রোহিঙ্গাদের একাংশ ভাসানচরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে বলে জানানো হয় সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। এক লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরে সরকারের যে পরিকল্পনা, সেটির সঙ্গে শুরু থেকে দূরত্ব রেখে চলেছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১