বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৪ April ২০২০

ভুল পদক্ষেপ

ফিরে আসা মানুষে করোনা ঝুঁকি বাড়বে রাজধানীসহ শিল্পাঞ্চলে


গাজীপুরের শ্রীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার অনেক পোশাক কারখানা আগামীকাল ৫ এপ্রিল খোলা হচ্ছে। ৪ এপ্রিল পর্যন্ত এ সব পোশাক কারখানাগুলো সাধারন ছুটির আওতায় ছিল। দেশে যখন সামাজির দুরত্ব বজায় রাখার জন্য সশস্ত্রবাহিনীসহ পুলিশ প্রশাসন নিরবিছিন্ন ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় গাদাগাদি করে শিশু বৃদ্ধসহ কর্মস্থলে ফিরছে দরিদ্র শ্রেণির মানুষসহ পোশাক শ্রমিকরা। চিকিৎসকরা বলছে এমন জনস্রোত করোনাভাইরাস ঝুঁকি নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দিবে।

গণপরিবহনের অভাবে অনেক কষ্ট করে ট্রাকসহ বিভিন্ন ছোট ছোট পরিবহনে ভেঙে ভেঙে ফিরছে শ্রমিকরা। এতে বিভিন্ন স্থানে জনসমাগমে পড়ছে তারা। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বাধ্যবাধকতা থাকলে তা হচ্ছেই না। ফলে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আসা শ্রমিকরা কারখানায় যোগদান করেই অজানা আক্রান্ত কেউ অন্যকে সংক্রমিত করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। ভয়ঙ্কর এমন সময় শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে আসায় বাধা না দেওয়া একটি আত্নঘাতী সিদ্ধান্ত বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন।

মহাসড়কে দায়িত্বরত প্রত্যক্ষর্শী পুলিশ সদস্যরা জানান, ৩ এপ্রিল রাত থেকেই দুরদুরান্ত থেকে ট্রাকে করে শিশু নারী পুরুষ বৃদ্ধসহ গাদাগাদি করে ফিরছে কর্মস্থলে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল হাওয়ায় এ সব স্থানে মানুষের আসার চিত্রটাও চোখে পড়ছে বেশি। তারা আরো জানান আজ শনিবার ৪ এপ্রিল আসার চিত্র জনস্রোতে রুপ নেয়। এরই মধ্যে নানা রোগ নিয়েও অনেকে ফিরেছে কর্মস্থলে। মাওনা চৌরাস্তা, বাঘের বাজার, গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ি, জৈনা বাজার, নয়নপুর, এমসি বাজার, বারোতোপা,রঙ্গিলা বাজার, মুলাইদ, ছাপিলা পাড়া, কেওয়া, ভবানিপুর, রাজেন্দ্রপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানা আগামীকাল ৫ এপ্রিল খোলা হচ্ছে। এ জন্যই শ্রমিকরা দল বেঁধে ফিরছে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে।  

মাস্টার বাড়ি এলাকার বাড়িওয়ালা আবদুল হালিম জানান, দেশে যখন করোনাভাইরাস মহামারী আকারে রূপ নিচ্ছে এমন সময় পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার কারনে শ্রমিকরা হুড়ুহুড়ি করে বিভিন্ন রোগবালাই বয়ে নিয়ে কর্মের জন্য কর্মস্থলে ফিরে আসছে। সরকার যখন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সবাইকে হোমকোয়ারেন্টাইনে থাকতে বল প্রয়োগ করছে তখন নিরুপায় শ্রমিকরা গাদাগাদি করে বাইরে থেকে আসছে এ সব এলাকায়। ফলে খুবই ঝুঁকিপুর্ণ হয়ে পড়েছে এ সব এলাকা। অনেকে এর মধ্যে বিভিন্ন রোগবালাই বয়ে নিয়ে আসছে দুরদুরান্ত থেকে।

বাড়িওয়ালা ময়েজউদ্দীন জানান, অনেক ভাড়াটিয়াকে বলেছি এক মাসের ভাড়া মওকুফ করে দিয়েছি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে যেন না আসে। তবুও অনেকে কাজ হারানোর ভয়ে ফিরে আসছে। কোনো ভাবেই তাদের ফেরানো যাচ্ছে না। এ সব এলাকা অধিক ঝুঁকিতে ফেলা হলো কারখানা খুলে দেওয়ার একটা ভুল সিদ্ধান্তে। এপ্রিল মাস এমনিতেই অধিক ঝুঁকির বলে জানাচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মকর্তারা। আজ ৪ এপ্রিল একদিনেই ৯ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগি শনাক্ত করা হয়েছে। মারা গেছে দুইজন। শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে এমন খবরে ভয় বেড়ে গেছে সবার মাঝে।

জামালপুর থেকে ফিরে আসেন পোশাক শ্রমিক সুমি আক্তার ও রাশেদ আহম্মেদ। তারা বলেন, কি করব বেতন না দিয়ে কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছিল। এ মাসের ৭/৮ তারিখে বেতন হতে পারে। আগামীকাল ফ্যাক্টরি খোলা হচ্ছে। কাজে যোগ না দিলে চাকরি হারাতে হবে আমাদের। আমরা নিরুপায় হয়েই অনেক কষ্টে ট্রাকে করে ফিরেছি। করোনার ভয়ের চেয়ে চাকরি চলে যাবার ভয় অনেক বেশি। চাকরি না থাকলে না খেয়ে এমনিতেই মারা যাব। 

দিনাজপুর থেকে ফিরেছেন পোশাক শ্রমিক হালিমা আক্তার ও তার স্বামী আব্বাস উদ্দীন। তারা জানান, দশ থেকে বারোটি পরিবহন পরিবর্তন করে কর্মস্থলে আসতে হয়েছে। পকেট শুণ্য নিয়ে বাড়ি গিয়ে আবার ঝুঁকি নিয়ে ফিরছি কাজের জন্য। বেতন দেওয়া হয়নি কারখানা বন্ধ ঘোষণার সময়।

তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অপরিকল্পিত ভাবে এ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সরকার ও কারখানা মালিক দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। বেতন দিয়ে যদি ছুটি দেওয়া হতো তাহলে কষ্ট হলেও শ্রমিকরা নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করত।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে গার্মেন্ট কর্মকর্তা জানান, এতো এতো শ্রমিকের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চত করতে পারবে না কোনো কারখানা কর্তৃপক্ষই। যদি বেতন দিয়ে কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হতো তাহলে এ উদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না। নিরুপায় শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ভয়ে করোনা ভয়কে তুচ্ছ করে কাজে ফিরছে। যা আগামীতে দেশের জন্য অশনিসংকেত বয়ে আনবে। এ ব্যর্থতা সরকার ও কারখানা মালিকদের।

ঢাকা জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের চিকিৎসক মামুনুর রহমান জানান, এপ্রিলের এ সময়টাতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে আসার জনস্রোত বিনা দ্বিধায় করোনাভাইরাস  সংক্রমণ বাড়িয়ে দিবে। শিল্পাঞ্চলে কর্মমুখী মানুষ গ্রাম থেকে  ফিরে আসাতে, শিল্পাঞ্চলেএখন করোনা ঝুঁকি বেড়ে গেল। এর প্রধান কারণ করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন তো আগেই হয়েছে বিদেশ ফেরত মানুষের মাধ্যমেই। যা  শুরুতে বন্ধ করা যায়নি। যতোটুকু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে তা এই ধরনের লক ডাউন দিয়ে এই ট্রান্সমিশন কমানো যেতো। চিকিৎসা বিজ্ঞান তাই বলে। এখন ঝুঁকিতে পরে যাবে শিল্পাঞ্চলের বাড়িওয়ালারা। দেশে চলছে করোনার দ্বিতীয় ধাপ। তৃতীয় ধাপে আরো ভয়াবহতা বাড়তে পারে।  তিনি বলেন বেশির ভাগ শ্রমিক সামাজিক দুরত্ত্ব মানবে না। এই মুহুর্তে গার্মেন্টস কর্মীরা খুবই ঝুঁকিতে থাকবে। পাশাপাশি তারা যে এলাকায় থাকে তাদের জন্যও ঝুঁকি বেড়ে গেল। এ সময় সংস্পর্শগত কারনে করোনার ঝুঁকি নিঃসন্দেহে বেড়ে যাবে। তিনি বলেন এ সব শ্রমিকদের ঘরে আটকে রাখাও অসম্ভব হবে না। 

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা শেখ শামসুল আরেফিন বলেন, কাল থেকে কাজে যোগ দেওয়া শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সুবিধা নিশ্চত করতে বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে বার বার কথা হচ্ছে। কারখানার ভিতরেও নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রাখতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। শ্রমিকরা যে ভাবে লম্ব‍া পথ অতিক্রম করে দল বেঁধে আসছে তাতে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হওয়ার সম্বাবনা ত থাকছেই। 

তিনি বলেন যেহেতু সরকার কোনো কারখানা বন্ধ করতে বলেনি, নিজ নিজ উদ্যোগে মালিকরাই বন্ধ রেখেছিল। তারা আবার কারখানা খুলে দিচ্ছে। তবে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি রেখেছি। সরকারের নির্দেশমত টেস্ট করা হচ্ছে সন্দেহভাজন মনে হলে। এখনো শ্রীপুরে কোনো পজেটিভ করোনা রোগি সনাক্ত হয়নি। জনসচেতনতামুলক কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। কাল থেকে রাস্তায় বের হওয়া মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসন বেকায়দায় পড়বে কি না এমন প্রশ্নে তিনি কোনো উত্তর দেননি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১