বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৮ March ২০২০

‘আমি আরিফ ভাইকে মারিনি’


কুড়িগ্রাম থেকে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার রাজস্ব) নাজিম উদ্দিন বলেন, আমি আরিফুল ইসলাম ভাইকে মারিনি। আমাদের যে শাস্তি হওয়ার তা হয়েছে। ওই ঘটনায় আমাদের যাদের নাম এসেছে তাদের সবাইকে ওএসডি করা হয়েছে। এসব নিয়ে তার বিরুদ্ধে আর কোনো সংবাদ প্রকাশ না করতে বাংলা ট্রিবিউনের যশোর প্রতিনিধিকে অনুরোধ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ডিসি সুলতানা পারভীন একটি পুকুর সংস্কার করে নিজের নামে নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। আরিফ এ বিষয়ে নিউজ করার পর থেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন ডিসি। এছাড়া সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করতে চেয়েছিলেন আরিফ। এ বিষয়ে জানতে পেরে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে তাকে বেশ কয়েকবার ডেকে নিয়ে সতর্ক করা হয়। সর্বশেষ ১৩ মার্চ মধ্যরাতে আরিফের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে তুলে ডিসি অফিসে এনে নির্যাতন করা হয়। এরপর তার কাছে আধা বোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা থাকার অভিযোগ এনে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠানো হয়।

সেদিন রাতে নাজিমের নেতৃত্বাধীন লোকজন দরজা ভেঙে আরিফের বাসায় ঢোকে। ঘরে ঢুকেই আরিফের মাথায় কিল-ঘুষি মারতে শুরু করে। মারতে মারতে তাকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে চোখ-হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টার দিতে চায়। আরিফকে বারবার বলে, তুই কলেমা পড়ে ফেল, তোকে এনকাউন্টার দেওয়া হবে।

৬ বছরেই অঢেল সম্পদ : নাজিম সরকারি চাকরি করছেন ৬ বছর হলো। এরই মধ্যে তিনি বেশ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার পৈতৃক বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। এলাকায় চারতলা বিশিষ্ট আলিশান বাড়ি নির্মাণের কাজ করছেন। তিন ইউনিটের এ ভবনের প্রতি তলা ২ হাজার ৯০০ স্কয়ার ফুটের। বাড়িটি নির্মাণে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। পুরো কাজ শেষ হতে এক কোটি ২০ লাখ টাকার মতো লাগবে। বাড়িটি যৌথ মালিকানার দাবি করা হলেও নাজিম ও তার স্ত্রী সাবিনা সুলতানার বক্তব্যে রয়েছে ফারাক। এলাকাবাসীর ধারণা, অবৈধ আয় প্রকাশ্যে না আনতেই ফাঁদা হয়েছে যৌথ মালিকানার গল্প।

জানা যায়, শৈশব থেকেই নাজিম নানাবাড়ি মনিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের কাশিপুর কাঁঠালতলা গ্রামে বসবাস করেন। বাবা নেছার আলী তিন বছর আগে মারা যান। বাবা দিনমজুর ও মা মাজেদা বেগম গৃহপরিচারিকার কাজ করেই লেখাপড়া শিখিয়েছেন নাজিমকে। তবে তাদের বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চাননি। কাশীপুর এলাকার বাসিন্দা ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সাবেক কর্মী মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল বারী ও তার স্ত্রী জানান, নেছার আলী একসময় টালির ভাটায় কাজ করতেন। দুই সন্তানের মধ্যে নাজিম বড়, মেয়েটি ছোট। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকে। তার স্বামী সচিবালয়ে চাকরি করেন।

তারা জানান, তাদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তার বাবা-মা খুব কষ্ট করে তাকে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। ৩৩তম বিসিএস ক্যাডারে ২০১৪ সালে চাকরিতে জয়েন করেন নাজিম। এর আগে এক্সিম ব্যাংকে বছর দেড়েক কাজ করেছেন। প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি হওয়ার মাস তিনেক পর নাজিমের বিয়ে হয় সাবেক প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে সাবিনা সুলতানার সঙ্গে। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরি পাওয়ার পর দিনবদল শুরু হয় তার। তিন বছর আগে মামা বাড়ির আড়াই শতক জমির ওপর নির্মাণ করেন একতলা বাড়ি। এ বাড়িতেই তার স্ত্রী, সন্তান ও মা থাকেন। সুসজ্জিত বাড়ির চারপাশে রয়েছে সিসি ক্যামেরা। এছাড়া মনিরামপুর পৌরসভার ভগবান পাড়ায় ৮ শতক জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি চারতলা বিল্ডিং।

এ বাড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে নাজিমের স্ত্রী সাবিনা বলেন, ভগবানপাড়ার ওই জমিটি আমার বাবা আমাকে ও আমার এক বোনকে দিয়েছেন। ওই বোনের স্বামী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। তিনি ও আমরা বাড়িটি যৌথভাবে করছি। নির্মাণকাজ শেষ হতে অনেক দেরি। নাজিমের দাবি, জমিটি তার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভায়রা ভাইয়ের টাকায় কেনা। এ বাড়ির মালিকানা তার ৭০ শতাংশ আর আমার ৩০ শতাংশ। বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করতে সোনালী ব্যাংকে ঋণের জন্যে আবেদন করেছি।

ওই বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাজের সাব-ঠিকাদার আতিয়ার রহমান বলেন, ২০১৭-১৮ সালে একই উপজেলার হোগলাডাঙ্গা গ্রামের মোখলেসের কাছ থেকে এ জমিটি কেনা হয় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা দিয়ে। চারতলা এ বিল্ডিংটির কাজ শুরু হয় ১১ মাস আগে। ছাদ পর্যন্ত হয়ে গেছে। এখন গাঁথুনির কাজ চলছে। এ পর্যন্ত ৫০ লাখের বশি টাকা ব্যয় হয়েছে। কাজ শেষ করতে এক কোটি ২০ লাখ টাকার মতো খরচ হবে। বাড়িটি নাজিম সাহেবের শ্বশুর প্রাইমারি স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক তদারকি করেন।

জমির বিষয়ে জানতে তার মোবাইল ফোনে কয়েক দফা চেষ্টা করে তা বন্ধ পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার কয়েকজন জানান, নাজিম সরকারি কর্মকর্তা। আবারো ক্ষমতাশালী হয়ে কর্মস্থলে ফিরে আসবেন তিনি। ফলে তার বিরুদ্ধে মুখ খুললে বিপদ অনিবার্য। তারা আরো জানান, ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি হওয়ার পর তার বিত্তবৈভব বেড়েছে। স্ত্রী ও মায়ের জন্য যে বাড়ি করেছে, তার ভেতরে গেলে বোঝা যায় তার কত অর্থ। এছাড়া পৌর এলাকায় যে বাড়ি করছে, তা অবৈধ উপার্জন দিয়েই। মূলত অবৈধ উপার্জন যাতে সামনে না আসে, সেজন্য বাড়িটি যৌথ মালিকানার বলে প্রচার চালানো হচ্ছে। এ গ্রামের পাশের গ্রাম হচ্ছে শ্যামকুড় ইউনিয়নের ঘুঘুরাইল। এখানকার বাসিন্দা ও ইউপি সদস্য ইউনুস আলী বলেন, এলাকাটি জামায়াত-বিএনপি অধ্যুষিত। নাজিমের বাবা-মামারা সবাই বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১