বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৪ September ২০১৯

মশকনিধনে বরাদ্দ বেড়েছে, জনবল বাড়েনি


রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে মশকনিধন খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রায় একশ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় জনবল বাড়েনি। সিটি করপোরেশন বলছে, মশকনিধন খাতে যে জনবল রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দের বিপরীতে জনবল না থাকায় বাজেট বাস্তবায়নে দুই সিটিকে হিমশিম খেতে হবে। দ্রুত এই খাতে জনবল বাড়ানোর পরামর্শ তাদের। বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেন তারা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্র জানায়, বর্তমানে দুই সিটির আয়তন বেড়ে ২৭০ কিলোমিটার হয়েছে। ৯৩টি ওয়ার্ড থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৯টিতে। এই পুরো এলাকার জন্য করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট জনবল ৭৩৪ জন। এর মধ্যে সরাসরি মশা নিধনে কাজ করছেন ৭০৯ জন। এত কম কর্মী দিয়ে নগরীর মশকনিধনে সফল হওয়ার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

দুই সিটি সূত্রে জানা গেছে, মশকনিধন খাতে চলতি অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং উত্তর সিটিতে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই খাতে দুই সিটিতে বরাদ্দ প্রায় একশ কোটি টাকা।

ডিএনসিসি মেয়র আতিক জানান, মশকনিধন কাজে তার সংস্থায় জনবল ২৯৫ জন। এর মধ্যে একজন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ৪ জন আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একজন সমন্বয়কারী (স্বাস্থ্য) ও ৯ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক রয়েছে। এ ছাড়া মাঠকর্মী (মশকনিধন কর্মী) রয়েছেন ২৮০ জন। সব মিলিয়ে সংস্থাটিতে জনবল মাত্র ২৯৫ জন। এই হিসাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে মাত্রা ৪-৫ জন কর্মী রয়েছেন। সম্প্রতি ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে এক মাসের জন্য কিছু জনবল দেয়। যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই মশকনিধন কাজে অভিজ্ঞতা না থাকার অভিযোগ আছে।

ডিএসসিসিতে মশকনিধন কাজের জন্য একজন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ৪ জন আঞ্চলিক বা সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ৫ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক রয়েছেন। এ ছাড়া, মাঠকর্মী (মশকনিধন কর্মী) রয়েছেন ৪২৯ জন। সব মিলিয়ে সংস্থাটিতে মশকনিধন কাজের জনবল ৪৩৯ জন।

২০১১ সালের শেষের দিকে দুই সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দুই সংস্থার পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আলাদা দুটি জনবল কাঠামোর প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু সেটি আজও ঝুলে আছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক কোটি ১০ লাখ নাগরিকের শহর কলকাতায় মশা নিধন খাতে জনবল ৪ হাজার ৩১৯ জন। কিন্তু প্রায় তিন কোটি ঢাকাবাসীর শহরে রয়েছে জন মাত্র ৭৩৪ জন। এ খুবই হতাশাজনক। ২৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দুই সিটির ১২৯ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে কমপক্ষে ২০ জন করে মশকনিধন কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। তবেই এই বরাদ্দ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও মশকনিধন কাজে সফলতা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। না হলে খণ্ডকালীন জনবল নিয়ে মশা নিধন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তাদের মতে, শুধু বাজেট বাড়িয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এ জন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ডিএসসিসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমান বলেন, মশকনিধনসহ পরিচ্ছন্নতার জন্য আমরা সার্বিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে, এত বড় এলাকার জন্য এত কম জনবল দিয়ে সব কাজ করানো আসলেই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তারপরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

একই সিটির ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বাবুল বলেন, মশকনিধনসহ পরিচ্ছন্নতার জন্য আমরা সার্বিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে, এত বড় এলাকার জন্য এত কম জনবল দিয়ে সব কাজ করানো আসলেই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ইতোমধ্যে জরুরি প্রয়োজনে অস্থায়ী ভিত্তিতে লোকবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সমস্যা সমাধানে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘২ কোটির বেশি নাগরিকের রাজধানী ঢাকায় এই সামান্য পরিমাণ মশকনিধন কর্মী কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। এজন্য অবশ্যই জনবল বাড়াতে হবে। প্রতিদিন প্রতিটি এলাকা মনিটরিং করতে হবে। কর্মী না বাড়িয়ে বাজেট বাড়ালে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।’

ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরো বলেন, ‘মশা নিধন কাজে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে একজন কর্মীর এরিয়া নির্ধারণ করতে হবে। একইসঙ্গে সে তুলনায় জনবলও নিয়োগ দিতে হবে। কর্মী না বাড়িয়ে বরাদ্দ বাড়ালে তা বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনকে হিমশিম খেতে হবে।’

ডিএসসিসির সচিব মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের যেসব চাহিদা ছিল, আমরা সব শর্ত পূরণ করে পাঠিয়ে দিয়েছি। তবু কেন লোকবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না, তা জানি না।’

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের কলকাতা শহরে মশকনিধন কাজের জন্য রয়েছেন ৪ হাজার ৩১৯ জন কর্মী। কিন্তু আমাদের যে কর্মী রয়েছে তা খুবই নগণ্য। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জনবল কাঠামো আরো বাড়ানো দরকার। তবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কিছু জনবল বাড়িয়েছি।’

ডেঙ্গুর অভিজ্ঞতা সারা বছর মশকনিধনে কাজে দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে কাজ করতে এসে আমরা শিখেছি যে, এটা শুধু কোনো মৌসুমের কাজ নয়; বরং এটা সারা বছর অর্থাৎ ৩৬৫ দিনের কাজ। আমরা সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি, তবে আমাদের লোকবল সংকট তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে বলে শঙ্কা রয়েছে। 

প্রায় একই বক্তব্য ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের। তিনি বলেন, ‘এত কম জনবল দিয়ে হিমশিম খেতে হবে। যে জনবল রয়েছে, তা খুবই কম। এরপরও কিছু আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘এমন অনেক বিষয় আছে। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিষয়টি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। খবর নিতে হবে।’

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দুই সিটি করপোরেশন থেকে অর্গানোগ্রামের বিষয়ে যে প্রস্তাবনা পেয়েছি, সেটি চূড়ান্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। যতদূর জানি জনপ্রশাসনও সেটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছে।’


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১