বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৩ September ২০১৯

ক্যাসিনো

রাজনীতিক ও পুলিশের ব্যবসা

খালেদ, সম্রাট ও শামীমকে হত্যার পরিকল্পনা


এবার একসঙ্গে মতিঝিলের চার ক্লাবে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। গতকাল রোববার বিকাল ৩টার দিকে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে মোহামেডান ক্লাব, ভিক্টোরিয়া ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব ও আরামবাগ ক্লাবে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানো হয়।

এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম, মদ আর নগদ টাকা। এর মধ্যে ভিক্টোরিয়া ক্লাব থেকে বিভিন্ন ধরনের জুয়া খেলার ৯টি বোর্ড, এক লাখ টাকা, বিপুল পরিমাণ তাস, জুয়ায় ব্যবহূত চিপস ও মদ পাওয়া গেছে। মোহামেডানে পাওয়া গেছে দুটি রুলেট টেবিল, ৯টি বোর্ড, বিপুল পরিমাণ কার্ড, ১১টি ওয়্যারলেস সেট ও ১০টি বিভিন্ন ধরনের চাকু। আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবেও বাকারা ও রুলেট টেবিলসহ বিভিন্ন জুয়ার সরঞ্জাম পেয়েছে পুলিশ। তবে সবগুলো ক্লাবই বন্ধ ছিল বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ডিসি আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ক্যাসিনো বন্ধ করার জন্যই আমাদের এই অভিযান। চারটি ক্লাবে অভিযান চালানো হয়েছে। সেখান থেকে ক্যাসিনোর সামগ্রী, টাকা ও মদ উদ্ধার করা হয়েছে। এখন আমরা এ ব্যাপারে তদন্ত করব, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কারা এর পৃষ্ঠপোষকতা করে। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব। জড়িত যেই হোক না কেন কাউকে আমরা ছাড় দেব না।

আগে থেকে সবাই পালিয়ে যাওয়ায় অভিযানে কাউকে আটক করা যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেহেতু এসব ক্লাবের একটি অংশ জুয়া খেলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল তাই ক্লাব চারটি সিলগালা করা হয়েছে।

পুলিশের নাকের ডগায় কীভাবে এসব ক্যাসিনো এত দিন চলে আসছে সেই প্রশ্নের জবাবে ডিসি মতিঝিল বলেন, যখনই আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, তখনই আমরা অভিযান চালিয়েছি। এর আগেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ক্যাসিনোর সামগ্রী এক দিনে আসেনি। তার মানে পুলিশ জানত না বা কিছু করেনি তা নয়। তথ্য পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সব সময় অভিযান পরিচালনা করেছে। হয়তো এত বড় পরিসরে হয়নি। মানুষ যেভাবে প্রত্যাশা করেছে সেভাবে হয়নি।

চারটি ক্লাব ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি ক্লাবেই ক্যাসিনোর বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম রয়েছে। জুয়া খেলার বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামও রয়েছে। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের এডিসি শিবলি নোমান জানান, বিকাল সাড়ে ৩টায় আরামবাগ ক্লাবে গিয়ে দেখা যায় সেখানে আগে থেকেই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। অন্ধকারে সবকিছু দেখা যাচ্ছিল না। তবে সেখানে ক্যাসিনো চলে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। এ ছাড়া অভিযানের খবর শুনে সবাই পালিয়ে গেছেন। দিলকুশায়ও কাউকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে রাজধানীর ভিক্টোরিয়া ক্লাবে অভিযান চালিয়ে নগদ এক লাখ টাকা, মদ, বিয়ার, জুয়া ও ক্যাসিনোর সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ।

গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ঢাকায় যুবলীগ নেতাদের ‘৬০টি ক্যাসিনো চালানোর’ খবর আসে সংবাদমাধ্যমে।

এ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই গত বুধবার বিকালে গুলশান ২ নম্বরের ৫৯ নম্বর সড়কে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া বাসা এবং ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে একযোগে অভিযান চালায় র্যাব। শাজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনিতে বেড়ে ওঠা খালেদ ফকিরাপুলের ওই ক্লাবের সভাপতি। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ওই ক্লাবে ক্যাসিনো বসিয়ে জুয়ার আড্ডা চালানোর বিপুল আয়োজন পাওয়া যায়। সেখান থেকে ২৪ লাখ টাকাও উদ্ধার করা হয়। আর গুলশানের বাসা থেকে খালেদকে গ্রেপ্তারের পর তার বাসায় ৫৮৫ পিস ইয়াবা, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা এবং অবৈধ অস্ত্র পাওয়ার কথা জানায় র্যাব।

ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবের পাশাপাশি ওই এলাকার ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র এবং বনানীর আহমেদ টাওয়ারে গড়ে তোলা একটি ক্যাসিনোতেও র্যাবের অভিযান চলে।

দেশের বিভিন্ন ক্লাবে অবৈধভাবে জুয়ার আসর বসানোর অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে। তবে বাংলাদেশেও যে স্লট মেশিন, রুলেট টেবিলের মতো সরঞ্জাম নিয়ে পুরোদস্তুর ক্যাসিনো চলে, সে খবর সাধারণ মানুষের কাছে নতুন।

পুলিশের নাকের ডগায় কীভাবে এসব ক্যাসিনো এত দিন চলে আসছে সেই প্রশ্ন ওঠে ইয়ংমেনস ক্লাবে র্যাবের অভিযানের পর। এর দুই দিনের মাথায় শুক্রবার ঢাকার কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ও ধানমন্ডি ক্লাবেও অভিযান চালায় র্যাব। কলাবাগান ক্রীড়া চক্র থেকে ক্লাব সভাপতি কৃষক লীগ নেতা সফিকুল আলম ফিরোজসহ পাঁচজনকে অস্ত্র-গুলি ও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ধানমন্ডি ক্লাবের বারে কী পরিমাণ মদের মজুদ আছে, সেই হিসাব জমা দিতে বলা হয়।

শনিবার চট্টগ্রামের পাঁচটি ক্লাবে একযোগে অভিযান শেষে তিনটি ক্লাবে জুয়ার আসর চালানোর প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয় র্যাবের পক্ষ থেকে।

রাজধানীতে ক্যাসিনোর অস্তিত্ব সম্পর্কে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে ২০১৭ সালের জুনে। পরের বছরের মার্চে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একটি সাধারণ ডায়েরি করে পল্টন থানায়। তারপরও ক্যাসিনোগুলো বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। পুলিশেরই একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, ক্যাসিনোগুলো চলছিল রাজনীতিক ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৮ জুন জননিরাপত্তা বিভাগের তৎকালীন উপসচিব তাহমিনা বেগম পুলিশ সদর দপ্তরকে ক্যাসিনো সম্পর্কিত একটি অভিযোগ সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠান। অভিযোগটি করেছিলেন মোহাম্মদপুরের আজিজ মহল্লা এলাকার বাসিন্দা মোবারক খান। চিঠিতে তিনি লেখেন, একটি অসাধু চক্র কয়েক মাস ধরে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, ফু-ওয়াং ক্লাব, ধানমন্ডি ক্লাব, সৈনিক ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, এজাজ ক্লাব, কলাবাগান ক্লাব ও পুরানা পল্টনে অবস্থিত জামান টাওয়ারে (১৪ তলায়) দীর্ঘদিন ধরে ক্যাসিনো চালাচ্ছে। এসব ক্যাসিনোয় অবৈধ মাদক বিক্রি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, সদর দপ্তর যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। তদন্ত করে পুলিশ কী আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে, সে সম্পর্কে সদর দপ্তর নিশ্চিত করতে পারেনি। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রগুলো বলছে, অপরাধ জগতে ‘পুলিশ-রাজনীতিক-সাংবাদিক’ একটি দুষ্টচক্র আছে। এই চক্রের কারণে কখনো অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সূত্রগুলো বলছে, ক্যাসিনো পরিচালনাকারীরা ছিলেন মূলত যুবলীগের নেতা। তারা শুধু টাকা-পয়সা দিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে রাখেননি, সপরিবার বিদেশে বেড়ানো, বিদেশে চিকিৎসা করানোর খরচও দিয়েছেন।

কখনোই কি অভিযান হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে একজন কর্মকর্তা বলেন, সকালে ক্যাসিনোয় তালা দিয়ে এসেছেন, বিকালে মিটমাট হয়ে গেছে। আবার ক্যাসিনো খুলে গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক ও বর্তমান অন্তত চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম এসেছে এই অভিযানের পর। এখন গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা।

জানা গেছে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম যেন কিছুতেই প্রকাশ না পায়, সেই চেষ্টা চালাচ্ছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা। অনেকে বলছেন, মামলার তদন্ত র‍্যাবই করুক। আবার কারো কারো ধারণা, আসামি হস্তান্তরের আগেই র‍্যাব জিজ্ঞাসাবাদ করে ফাইল বানিয়ে রেখেছে।

দেশে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির টাকা ছাড়াও ক্যাসিনোর টাকার ভাগ যেত বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের কাছে। সে টাকা পাঠানো হতো ওমানের মাসকট ব্যাংকের মাধ্যমে। ওমানে থাকা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নাদিম সেখান থেকে টাকা তুলে জার্মানিতে থাকা জিসানের কাছে পৌঁছে দিত। ঢাকা থেকে এই আয়োজন করে দিতেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীম গং। সব সময় একই রুট অনুসরণ করা হতো না। কখনো কখনো সিঙ্গাপুর হয়েও টাকা যেত জিসানের কাছে। যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া রিমান্ডে এ তথ্য জানিয়েছেন বলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র। আর গোয়েন্দা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এসব তথ্যের সত্যতা রয়েছে।

সূত্র জানায়, জি কে বিল্ডার্স নামের একটি কোম্পানি বর্তমানে শামীমের নামে থাকলেও তা একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ছিল। জিসান দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কোম্পানিটির হাল ধরেন অপর সন্ত্রাসী নাদিম ওরফে টিএনটি নাদিম। এরপর নাদিমও দেশছাড়া হলে তা জি কে শামীমের হাতে চলে আসে। এই জিসান, নাদিম ও শামীম-তিনজনই বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় যুবদলের রাজনীতি করতেন।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু বড় বড় টেন্ডারে কাজ পেয়েছে জি কে বিল্ডার্স। আর সেখানে সহায়তা করছেন যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অন্য কেউ টেন্ডার জমা দিলেও সম্রাট ও খালেদের হস্তক্ষেপে তা বাতিল হয়ে যেত। কাজ যেত জি কে বিল্ডার্সের হাতে। এর থেকে আয় করা টাকার একটা মোটা অঙ্ক সম্রাট ও খালেদ পেতেন।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্য সূত্রটি আরো জানায়, এই জি কে বিল্ডার্সের একটি শাখা রয়েছে সিঙ্গাপুরে। যেখানে টিএনটি নাদিম বসেন। শামীম, সম্রাট, খালেদও মাঝে মধ্যে সেখানে যান। আর ওদিকে জার্মানি থেকে উড়ে আসেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানও। ওই অফিসে বসেই টেন্ডার বাগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাগুলো হয়। তবে শুধু সিঙ্গাপুরই নয়, ওমানের রাজধানী মাসকটও এই সন্ত্রাসী চক্রের আরেকটি হাব বলেও জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে এসেছে বলে জানায় গোয়েন্দা সূত্র।

সূত্রমতে, সন্ত্রাসী টিএনটি নাদিম মাঝে মধ্যে ওমান ও দুবাইতে গিয়েও থাকেন। সেখান থেকে ঢাকায় তার লোকজন দিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। জিসান ও নাদিমের হয়ে যারা কাজ করছেন মগবাজার টিএনটি কলোনির জাকির, নয়া টোলার সেন্টু ও শোভন, বাড্ডার নাসির ও খোকন। এখনো তারা জিসান ও নাদিমের হয়ে চাঁদাবাজি করছেন বলেও গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

আর টেন্ডারবাজিতে সম্রাট, খালেদের সহায়তায় কাজ না হলে, সন্ত্রাসী এই চক্রটিকে কাজে লাগিয়ে হত্যা, অপহরণের হুমকি দিয়ে টেন্ডার বাগিয়ে নেওয়া হতো। অধিকাংশ সময়ে সহায়তায় কাজ হতো। ফলে টেন্ডার বাগানোর পর নাদিম ও জিসান সিঙ্গাপুরে চলে যেত আর শামীম, সম্রাট ও খালেদ উড়াল দিতেন ঢাকা থেকে। সেখানে চলত তাদের নানারকম মৌজ-মাস্তি, জানায় গোয়েন্দা সূত্রটি।

এই টেন্ডার ও ক্যাসিনোর টাকার ভাগ সিঙ্গাপুর থেকে ওমানের মাসকট ব্যাংকে পাঠানো হতো। আর সেখান থেকে ঢাকা যেত জার্মানিতে। ওমানের মাসকট ব্যাংকে যে অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হতো সেই অ্যাকাউন্টের নম্বর গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে এমনটা জানিয়ে সূত্রটি ৪৮৩৭৯১৩১৯৪৭৯৭৯৭৮ নম্বরটিকে ওই অ্যাকাউন্ট নম্বর বলে এই প্রতিবেদককে জানায়।

সূত্র জানায়, এই টাকা সরাসরি কখনো সম্রাট আবার কখনো খালেদ নিজেই পাঠাতেন। আবার মাঝে মধ্যে জাকির ও আরমানের মাধ্যমে টাকা মাসকট ব্যাংকে পাঠানো হতো।

আরো জানা যায়, কিছুদিন হলো শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে যুবলীগের খালেদের দ্বন্দ্ব দেখা দেওয়ায় জিসান নাদিমকে দায়িত্ব দেয় খালেদকে শায়েস্তা করার জন্য। নাদিম ও জিসান দুবাইয়ের বুরুজ খলিফা টাওয়ারে বসে খালেদ, সম্রাট ও শামীমকে গুলি করে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ জন্য একে-২২ অস্ত্রও কেনা হয়। আর এ দায়িত্ব দেওয়া হয় মগবাজারের শোভনকে। তবে গোয়েন্দারা ওই অস্ত্রটি উদ্ধার করলে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

গোয়েন্দারা জানান, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ নানা ধরনের তথ্য দিতে শুরু করেছেন। যা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। খালেদের কাছ থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সব তথ্য যেন পাওয়া যায় সে ব্যাপারে সতর্ক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে জানায় সূত্রটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিজ্ঞাসাবাদ সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, অনেক রকম ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেসব তথ্যও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহজাহান সাজু বলেন, খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে নানা ধরনের তথ্য এসেছে। তবে মানি লন্ডারিং বিষয়ে এখনো আমরা কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করিনি। এটি সিআইডির সংশ্লিষ্ট শাখা জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) শারমিন জাহান বলেন, খালেদের বিরুদ্ধে গুলশান ও মতিঝিল থানায় দুটি মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। সেগুলোর কাগজপত্র আমরা এখনো হাতে পাইনি। কাগজপত্র হাতে এলে তা পর্যালোচনা শেষে আমরা তদন্ত শুরু করব। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে কোন দেশের কোন ব্যাংকে টাকা গেছে সেটিও তদন্ত করে বের করা হবে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো ছিল। এর মধ্যে ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বাকি পাঁচটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের লোকজন। তবে সম্রাট নিজে সরাসরি ক্যাসিনো দেখাশুনা করতেন না। তার ক্যাসিনো চালাতেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। তারাই এক বছর আগে পল্টনের প্রীতম জামান টাওয়ারে ক্যাসিনো চালু করেন। পরে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাসিনোর দুই হোতা আবু কাওসার ও মমিনুল হক এখন বিদেশে রয়েছেন। সম্রাট গত বুধবার থেকে নিজের কার্যালয়েই অবস্থান করছেন।

যুবলীগ নেতা সম্রাটের বক্তব্য জানতে গতকাল কয়েক দফা যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি। তার নম্বরে ফোন করা হলে এক ব্যক্তি ফোন ধরে বলেন, তিনি বিশ্রামে আছেন। এরপর আর কেউ ফোন ধরেননি। তার কার্যালয়ের সামনে গেলে সেখানে থাকা কর্মীরা জানান, অনুমতি ছাড়া ভেতরে যাওয়া যাবে না।

অনেক ক্লাবের কর্মকর্তারা বলছেন, ভয় দেখিয়ে ক্লাবের জায়গা দখল করে ক্যাসিনো করা হয়েছে। যুবলীগ নেতাদের এ কাজে সহযোগিতা করেছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশি পাহারায় রাতভর ক্যাসিনো চলেছে। গত শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ সভায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। ডিএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি বলেন, অবৈধ ক্যাসিনো পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এর হাত থেকে রক্ষা পেতে অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।

সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, জুয়া বা ক্যাসিনো বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। শুধু ক্যাসিনো নয়, বিভিন্ন সেক্টরে এই অভিযান চলবে। সরকারের প্রভাব খাটিয়ে যারা অন্যায় কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ক্লাবপাড়ার একাধিক সূত্র বলেছে, ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবও যুবলীগের প্রভাব খাটিয়ে দখল করেছিলেন খালেদ মাহমুদ। এই ক্লাবের সভাপতি ছিলেন মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন। তাকে হটিয়ে খালেদ অনেকটা জোর করে ক্লাবের দায়িত্ব নিয়ে ক্যাসিনো চালাতে শুরু করেন।

আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবের চরিত্র একই রকম। সরকার বদলের পর এই দুটি ক্লাবেরই সভাপতি হন আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক। তিনি অন্তত পাঁচটি ক্লাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তিনি ইসমাইল হোসেন চৌধুরীর‍ ঘনিষ্ঠ লোক বলে পরিচিত। তবে আরামবাগ ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী শাহাজাদুল ইসলাম। ২০০৯ সালে জুয়া বন্ধে প্রতিবন্ধকতা সরাতে তিনি হাইকোর্টে রিট করেছিলেন।

ক্যাসিনোর কারণে বন্ধ হওয়া আরেক ক্লাব ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের সভাপতি কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কায়সার। ক্লাবপাড়ার লোকরা বলেন, ওয়ান্ডারার্স ডুবেছে ক্যাসিনোয়। এই ক্লাবে ক্যাসিনো চালান রশিদুল হক। তিনিও ২০১০ সালে জুয়া বন্ধে প্রতিবন্ধকতা সরাতে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন।

ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন কাশেম নামের এক ব্যবসায়ী। মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া ক্লাব চালান। অভিযোগ আছে, তাকে চাপের মুখে ফেলে মমিনুল হক সেখানে ক্যাসিনো চালু করেন। তিনি এর প্রতিবাদ করেও সুফল পাননি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১