আপডেট : ০১ March ২০১৯
নাটোরের গুরুদাসপুরে নদী কেটে বানানো হচ্ছে খাল। প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নাটোরের গুরুদাসপুরে আত্রাই নদী খনন করে নাব্যতা সৃষ্টির নামে নদী কেটে খালে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে ওয়েস্টার্ন ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। নদীর কাটা মাটি নদীতেই রাখা হচ্ছে। ফলে বড় ধরণের বৃষ্টি অথবা বর্ষা মৌসুমে নদীর কাটা মাটিতেই আবার নদী ভরাট হয়ে যাবে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খাল খননের পুরো টাকাটাই গচ্চা যাবে। স্থানীয়রা আরো অভিযোগ, প্রায় ৩শ’ ফিটের নদীর মাঝখানে ৩০-৪০ শতাংশ জায়গা খনন করা হচ্ছে। এতে নদীতে নালা তৈরি হচ্ছে। আর দুইপাশ সংকুচিত হয়ে নদীর প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আত্রাই ও গুমানী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন (বিআইডাব্লিউটিএ) কর্তৃপক্ষ নাটোর অংশে গুরুদাসপুর উপজেলার যোগেন্দ্র নগর রাবার ড্যাম থেকে পাবনা জেলার এরশাদনগর পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার নদী খননের উদ্যোগ নেয়। একাজে ব্যয় ধরা হয় ৪২ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা । ওয়েস্টার্ন ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজটির বাস্তবায়ন করছে। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে নদীতীরের বিল বিয়াস এবং বিলকাটরী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আত্রাই নদীতে এক্সকেভেটর মেশিন দিয়ে মাটি খনন করছেন। খননকৃত মাটি নদীর ভিতরের কাটা অংশের দুপাশে স্তুপিকৃত করে রাখা হয়েছে। অদুরে বিলকাটরিতে চলছে তাদের খনন কাজ। সেখানে কথা হলো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাব কন্ট্রাক্ট নেওয়া আলম খানের সাথে। তিনি জানান, মাটি কাটার জন্য মেশিনপত্র নিয়ে তিনি ঢাকা থেকে এখানে এসে মাটি কাটছেন। ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৮০ ফিট প্রশস্ত এবং ১২ /১৩ ফুট গভীর করে মাটি কাটা হচ্ছে। নদীর মধ্যে মাটি রাখা হচ্ছে কেন এবং বর্ষা ও বৃষ্টির পানিতে ভরাট হয়ে যাবে কিনা এ প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, ঠিকাদার যেভাবে বলছেন সেভাবেই তিনি কাজ করছেন। এর বেশী কিছু আমি জানিনা। তবে তিনি বলেন , এভাবে মাটি থাকলে বৃষ্টি বা বর্ষায় নদী ভরাট হয়ে যাবে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের একাংশের সাইড ম্যানেজার মফিজুল ইসলাম দাবী করেন, দরপত্রে উল্লেখ আছে ৮০-৮২ ফুট প্রস্থে গভীরতা ১০-১২ ফিট এবং খননের জায়গা থেকে ৩৮-৪০ ফিট দুরত্বে মাটি ফেলার নির্দেশ রয়েছে। বিলকাটর গ্রামের জাহেদ আলী, সাব্বির হোসেন বলেন, নদীর মধ্যে মাটি কেটে নদীতেই রাখা হচ্ছে এমন কান্ড কখনোই দেখিনি। বিল বিয়াস গ্রামের ময়লাল হোসেন বলেন, আমরা নদী কাটার কথা শুনে আনন্দিত হয়েছিলাম। শুস্ক মৌসুমে পানি থাকবে, আমাদের সেচ কাজ সহ শুস্ক মৌসুমে নদীতে নৌকা চলবে। কিন্তু মাটি কাটার ধরণ দেখে বুঝতে পারছি আমাদের কোন আশাই পূরণ হবেনা। বরং নদী কেটে খালে পরিণত করা হচ্ছে। একই গ্রামের আল আমিন বলেন, বর্তমানে নদী কেটে এমনভাবে মাটি রাখা হয়েছে যে, আমরা নদীতেই নামতে পারছিনা। পা কাদাতে দেবে যাচ্ছে। বতর্মানে নদী ১৮০ থেকে ২২০ ফুট প্রশস্ত। অথচ কাটা হচ্ছে চল্লিাশ থেকে ৫০ ফুট মাত্র। আবার নদীর মধ্যে পানি রাখায় বর্ষা মৌসুমে নদীর তিনটি শ্রোত তৈরি হবে। এমন কাজ আমরা আশা করিনি। মামুন হোসেন নামে এক যুবক বলেন, সরকারের উন্নয়নের অংশ হিসেবে নদী খনন কাজ করা হচ্ছে। অথচ নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা হরিলুট হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহ প্রধান মন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামান করেন। নাটোর -০৪ এর স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস বলেন, মাটি কেটে খাল বানানোর কথা শুনে আমি সরেজমিনে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাই। আমি নিজের চোখে দেখেছি নদী কেটে খাল বানানো হচ্ছে। ফলে আমি নদী কাটা বন্ধের নির্দেশ দেই। পরবর্তীতে বিআইডাব্লিউটিএ প্রকল্প পরিচালক এবং অতিতিক্ত সচিব আমাকে ফোনে জানান, নদী ৮০ ফুট থেকে ১২০ ফুট প্রশস্ত করে খননের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া নদীর ভিতরের মাটি তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা অথবা নদীর পাড়ে রাখা হবে। ফলে তাদের কাজ করার বিষয়ে আমি সম্মত হয়েছি। তবে এ প্রতিবদেক নদী কাটা অংশ সহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছন নদীর মাটি সরানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। নদী রক্ষা কমিটির গুরুদাসপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি এবং গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, তিনি এলজিইডির ইঞ্জিনিয়াকে সাথে নিয়ে নদী খনন পরিদর্শন করেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে নদী খনন যথাযথ করা হচ্ছেনা। এলজিইডির গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী রতন কুমার ফৌজদার জানান, সাধারণ দৃষ্টিতেই বোঝা যায় মাটি সরিয়ে না নিলে এর সুফল কেই পাবেনা। নদীর ভিতর থেকে মাটি অপসারন করতেই হবে। চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়কারী ওবড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান বলেন, নদী খননে অনিয়ম হলে কোনো সুফল আসবে না। নদীর মাটি পাড়ের ওপর না ফেললে গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়বে না।বরং এতে দখলদারদের সুবিধা হবে। আর প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারদের পকেট ভারী হবে। বিআইডাব্লিউটিএ-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সাইদুর রহমান জানান, নদী খননের কোনো মাটি নদীর মধ্যে থাকবে না। সব সরিয়ে নেয়া হবে। এতে নদী প্রশস্ত হবে এবং গভীরতাও বাড়বে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১