রাজনীতি

ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে সব ইসলামী দল

বৃহত্তর ঐক্যের পথে জামায়াত

  • ''
  • প্রকাশিত ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

এম এ বাবর:

রাজনীতিতে বৃহৎ একটি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে নতুন করে আলোচনায় আসে দলটি। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র সংস্কারের সব কাজে সামনের সারিতে দেখা যায় জামায়াতকে। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের আগে যেনতেন করে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন চান না দলের শীর্ষ নেতারা।

এ দিকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। আমিরসহ দলটির শীর্ষ নেতারা নানা কর্মসূচি নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা সফর করছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে ইসলামিক দলগুলো নিয়ে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ গড়তে তৎপর জামায়াত। ইতোমধ্যে কয়েকটি ইসলামিক দল এবং সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেছে দলটি। একই সঙ্গে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক করেছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা।

অন্যদিকে, সম্প্রতি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছেন, তারা এত দ্রুত নির্বাচন চান না। অন্তর্র্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য আরও সময় দেওয়ার পক্ষে তারা। তার এই বক্তব্য বিএনপিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কারণ বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। তারপরও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা সবাই মনে করছেন, একটি আদর্শ রাষ্ট্র গড়তে আগে রাষ্ট্রের সব খাতে সংস্কার, তার পরে নির্বাচন। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে দলের নেতা-কর্মীরা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শহীদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অর্থ সহযোগিতা এবং সবশেষ ভারতের পানি আগ্রাসনের পর বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় উপহার সামগ্রী পৌঁছে জয় করে নিয়েছেন নেটিজেনদের মন। সব মিলিয়ে এখন আলোচনায় জামায়াতের আগামী দিনের রাজনীতি কোন পথে?

একদিকে দল গোছানো, অন্যদিকে জনসম্পৃক্ততার কাজে সময় ব্যয় করছে দলটি। ইসলামী দলগুলোকে একত্রিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন দলটির নেতারা। চেষ্টা করছেন একটি বৃহত্তর ইসলামিক ঐক্য গড়ে তোলার। গত ২০ আগস্ট থেকে ইসলামিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে জামায়াতে ইসলামী। সে দিন কওমি ঘরানার ইসলামী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মগবাজারে। এ দিন বিকালে ফরায়েজী আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে।

এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী পশ্চিমা বিশে^ নিজেদের একটি উদারপন্থি ইসলামিক দল হিসেবে পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের দৃষ্টিতেও নিজেদের পজেটিভ ইমেজ তৈরি করেছে দলটি। বিভিন্ন সময় মন্দির এবং হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়ে জামায়াতের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করলেও জামায়াত প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এটি আওয়ামী লীগের ইন্ধনে হয়েছে। যখন জামায়াতকে জড়িয়ে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করে, ঠিক সে সময় জামায়াতের নেতা-কর্মীদের দেখা গেছে মন্দির এবং সনাতনধর্মীদের বাড়ি ও মন্দির পাহারা দিতে। এসব কিছুই দৃষ্টি কেড়েছে অন্য ইসলামিক দলগুলোর।

ইসলামিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এখন থেকে আমরা সবাই একে অপরের জন্য। সবাই সিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ থাকব, ইনশাল্লাহ। অতীতের কোনো আচরণের জন্য আপনারা যদি সামান্য কষ্ট পেয়ে থাকেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই। আশা করি, আপনারা আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। তার এমন উদারতা মন জয় করে নেয় সভায় থাকা অতিথিদের।

এদিকে গত ১২ আগস্ট প্রথম দেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে জামায়াতে ইসলামী। রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের ঢাকা মহানগর কার্যালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট দীনবন্ধু রায়, নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট প্রদীপ কুমার পাল, মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীকে হিন্দুবিদ্বেষী দল হিসেবে অপপ্রচার চালানো হয়। অথচ দেশে হিন্দুসহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সুরক্ষার জন্য জামায়াতে ইসলামী প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘হিন্দুসহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সুরক্ষায় জামায়াতের পক্ষ থেকে আমরা দুটি দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছি। প্রথমত, রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে সুরক্ষা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাধীন কমিশন করে হিন্দুসহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা-নির্যাতনের বিচার করতে হবে।’

বৈঠকে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জামায়াত হিন্দুদের ওপর কোনো প্রকার সহিংসতায় বিশ^াস করে না। যে কোনো অন্যায় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমানসহ সব ধর্মেই নিষিদ্ধ। আমি নিজে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার এমপি ছিলাম। আমাকে অনেক হিন্দু ভোট দিয়েছিল। তারা আমাদের বিশ^াস করে। আমাদের ওপর তাদের পুরোপুরি আস্থা আছে। এটা আমাদের আদর্শিক দায়িত্ব। জামায়াত এই আদর্শিক দায়িত্ব থেকেই সারা দেশে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ও বাসা-বাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।’

হিন্দু-বৌদ্ধসহ অন্য ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বাইরেও যদি আপনাদের জামায়াতকে প্রয়োজন বলে মনে হয়, তবে যে কোনো সময়ে আমাদের ফোন করবেন। আমরা সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়াব।

এরপর ২৫ আগস্ট জামায়াতের গুলশান থানার উদ্যোগে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গুলশান, নর্দ্দা ও কালা চাঁদপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নেন।

গত ১৮ আগস্ট ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাজনীতি করতে হবে উদার ও সহানুভূতির মন নিয়ে। ধর্ম-বর্ণের পার্থক্য ভুলে সবাইকে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যদি জামায়াতকে তাদের নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে জামায়াত সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করবে। এ সময় প্রফেসর সুকমল বড়ুয়া বলেন, জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করবে এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করবে। তিনি রাজনৈতিক নেতাদের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এ ছাড়া সারা দেশে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে যাচ্ছেন দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা।

অন্যদিকে দেশ ও জাতির কল্যাণে জামায়াতের সদস্যদের যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার জন্য আহবান জানিয়েছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। সম্প্রতি দলের এক সদস্য সম্মেলনে তিনি বলেন, জামায়াতের ঘরের খুঁটি হচ্ছে সদস্য। সদস্য শব্দের অর্থ পিলার, খুঁটি ও স্তম্ভ। মূলত ভার বহন করতে সক্ষম এমন কিছুকেই সদস্য বলা হয়। পবিত্র কালামে হাকিমে এই শব্দটি দুই স্থানে এসেছে। আর সাংগঠনিক পরিভাষায় এটি খুবই তাৎপর্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাই এই বিজয়কে টেকসই ও অর্থবহ করতে জামায়াতের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকারকে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে অন্তর্র্বর্তী সরকারকে আমরা সময় দিতে চাই। যৌক্তিক সময় দেওয়া উচিত। খুব বেশিও দেওয়া উচিত না, কম দিয়ে তাড়াহুড়াও করা উচিত না। যৌক্তিক সময় দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় প্রশাসনে বসে ছিল, পুলিশে হোক, বিজিবিতে হোক, আর্মিতে হোক, বিচারালয়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যেখানে যাকে যেখানে বসিয়েছিল এই দলীয় লোকগুলোকে সরিয়ে সেখানে নিরপেক্ষ লোককে বসাতে হবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির এবং সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সব ধর্মের ঐক্য ছাড়া জাতি এগোতে পারবে না। জগদ্দল পাথর এক স্বৈরশাসক ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে যেমন টিকতে পারেনি, তেমনি আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র টিকতে পারবে না। ছাত্র-জনতা সবাই যার যার অবস্থান থেকে সঠিক দায়িত্ব পালন করলে আমাদের এই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর ভবিষ্যতে আর কেউ আঘাত করতে পারবে না।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে হিন্দুবিদ্বেষী দল হিসেবে অপপ্রচার চালানো হয়। অথচ দেশে হিন্দুসহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সুরক্ষার জন্য জামায়াতে ইসলামী প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত সাড়ে ১৭টি বছর বাংলাদেশের জনগণের জীবনে ছিল দুঃসহ কালরাত। ঐক্যের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে যেকোনো মূল্যে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এই ঐক্য আমাদের ধরে রাখতে হবে। যে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন হয়েছিল, কোনো অবস্থায় এমন আরেকটা স্বৈরশাসন কখনো যেন বাংলাদেশে ফিরে না আসে তার ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে আমাদের মাথায় কেউ কাঁঠাল ভেঙে খেতে পারবে না ইনশাল্লাহ।’

তিনি বলেন, খুব পরিষ্কার করে বলছি, বাংলাদেশের কোনো জায়গায় জামায়াতে ইসলামী বা ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যারা কাজ করে, তারা যদি কোথাও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কোনো অপকর্ম করে তাহলে সে একজন দুর্বৃত্ত। কথা দিচ্ছি, আমরা কোনো দুর্বৃত্তকে তো প্রশ্রয় দেব না। এ অপকর্মের জন্য আমরা তার পাওনা বুঝিয়ে দেব।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads