বিদ্যুৎ ও জ্বালানি

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতে নজর সরকারের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৬ জুলাই, ২০২২

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালু হলে চলমান বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে। এমনটাই আশা করছে সরকার। তাই বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে এখন কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করার মতো কেন্দ্র থাকার পরও জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি পার্থক্যে প্রায় হারিয়ে যাওয়া লোডশেডিং আবার এসেছে ফিরে। গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে সরকার। ভর্তুকি কমাতে জ্বালানি আমদানির রাশ টানতে হচ্ছে। তাতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। আর বিদ্যুৎ সরবরাহ কমলে কমবে শিল্পোৎপাদন।

এই উভয় সংকটের মধ্যে আবার ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। বর্তমানের চেয়ে দাম বাড়লে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির পারদ আরো চড়বে। তাতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে অর্থনীতিতে চাপ আরো বাড়বে। সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে সরকারকে। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় যাবে। তাদের মতে, দেশের বড় দুই কেন্দ্র তো আছেই, সেইসঙ্গে ভারতের আদানি থেকে বিদ্যুৎ পেলে জ্বালানি সংকট থেকে দেশ বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। 

সূত্র বলছে, দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রার ১৩২০ মেগাওয়াট এখনও ঢাকায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হবে। এরমধ্যে চালু হতে যাচ্ছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটা থেকেও ১৩২০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে। আপাতত ওই কেন্দ্রে চালু হচ্ছে ৬৬০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট। এছাড়া, ভারতের আদানি পাওয়ার কোম্পানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। যা থেকে পাওয়া যাবে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

সমপ্রতি বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে সরকার সাশ্রয়ী নীতি নিয়েছে। যার কারণে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শিডিউল লোডশেডিং করছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। রাত ৮টার পর বন্ধ রাখা হচ্ছে দোকানপাট।

তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখলেও আমদানি করা কয়লাচালিত কেন্দ্র পায়রার উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রটি এখন গ্রিডে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ দিচ্ছে। যার কারণে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি তুলনামূলক কম। কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ ঢাকায় আনার জন্য পদ্মা সেতুর পাশ দিয়ে একটি সঞ্চালন লাইনও নির্মাণ করা হচ্ছে। পটুয়াখালী থেকে গোপালগঞ্জ এবং গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত পৃথক লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে।

এরমধ্যে, পদ্মা সেতু এলাকায় টাওয়ার নির্মাণ শেষ হলেও তার টানানোর কাজ বাকি। নদীর দুই প্রান্তের লাইন নির্মাণের কাজ শেষ হলে পায়রার বিদ্যুৎ ঢাকার আমিন বাজার পর্যন্ত আনা সম্ভব হবে।

পিজিসিবির এক কর্মকর্তা জানান, ১০ জুন পদ্মা সেতুর ওপরের সব টাওয়ার পিজিসিবি বুঝে পেয়েছে। সাধারণত টাওয়ার বুঝে পাওয়ার পর থেকে ছয়-সাত মাস সময় লাগে কাজ শেষ করতে। অর্থাৎ, ডিসেম্বর নাগাদ সময় লাগার কথা। তবে চলমান সংকটের কারণে আরো আগেই কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমপ্রতি বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। চালু হবে রামপালও। ভারতের আদানি পাওয়ারপ্ল্যান্ট থেকেও আমদানি হবে ১৬০০ মেগাওয়াট। তখন ৪ হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির (বিআইএফপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদ একরাম উল্লা বলেন, সব শিডিউল অনুযায়ী চললে সেপ্টেম্বর নাগাদ রামপাল কেন্দ্রটি চালু হবে। আগামী ১০/১৫ দিনের মধ্যেই কেন্দ্রটির জন্য কয়লা আসবে ইন্দোনেশিয়া থেকে। আরো বড় চালানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, আদানি সম্ভাব্য সময় দিয়েছে অক্টোবর। এরমধ্যে অন্য কোনো সমস্যা হলেও ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পায়রা সঞ্চালন লাইন তৈরি হবে। তিনি বলেন, পায়রা থেকে এখনই আমরা ১০০০ মেগাওয়াট পাচ্ছি। সঞ্চালন লাইন হলে আরো ২০০ মেগাওয়াট যোগ হবে। আদানি থেকে প্রথমে ৮০০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে। এরপর মার্চের মধ্যে বাকি ৮০০ মেগাওয়াট আসবে বলে আশা করছি। এছাড়া এস আলমের বাঁশখালীর কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটও ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে বলে জানান তিনি।

জানা যায়, বাংলাদেশের ১৫২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট আমদানি এবং ক্যাপটিভসহ মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। গত এপ্রিলে দেশে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়। আর ১ জুলাই থেকে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় ১৫০০ মেগাওয়াটের মতো কম বিদ্যুৎ উপাদন হচ্ছে। এখন দৈনিক চাহিদা ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাধ্যমে চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা সম্ভব। আর তা করা গেলে দৈনিক হয়তো ৫০০ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হবে। সেটা রেশনিংয়ের মাধ্যমে অতিক্রম করা যাবে।

বর্তমানে উৎপাদিত এই বিদ্যুতের ৫১ শতাংশই আসে গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে। এগুলোর জন্য যে পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন, তা দেশে উৎপাদিত মোট গ্যাসের প্রায় কাছাকাছি।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, গত বৃহস্পতিবার দেশে ২৩৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে। বিপরীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদা ছিল ২২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু পেট্রোবাংলা শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন, সার কারখানা, আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ ঠিক রেখে চাহিদার ৪০ ভাগের মতো গ্যাস দিতে পারছে বিদ্যুতের জন্য।

গ্যাসের বিকল্প উৎস এখন আমদানি করা এলএনজি। দিনে প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি হচ্ছিল, যে পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে স্পট মার্কেটের এলএনজি আমদানি বন্ধের পর গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে বিদ্যুতের জন্য। সেদিন থেকেই ফিরেছে লোডশেডিং।

আমদানি করতে গিয়ে সরকারকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের তথ্য। চলতি অর্থবছরে বাজেটে ভর্তুকির প্রাক্কলন আরো বাড়ানো হলেও এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি কমানোর পথে হাঁটতে চাইছে সরকার। 

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী-জানতে চাইলে জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, উত্তরণ ঘটানোর খুব একটা পথ এ মুহূর্তে নেই। তবে সাময়িক সময়ের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনে ভর্তুকি দেওয়ার তো একটা সীমা আছে। এই সীমা অতিক্রম করেছে। এখন দুটো অপশন আছে। একটা বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো। সেটা প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়তে পারে। আরেকটা হল ট্যারিফ না বাড়িয়ে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা যে দামে গ্যাস কিনছি, সেই দামে যদি বিক্রি করি, তাহলে কারো পক্ষে সম্ভব হবে না এটা অ্যাফোর্ড করা। স্পট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এই দুই বাজার থেকে কিনলে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম পড়ে ৫৯ টাকা। আর আমাদের গ্যাসের সঙ্গে মিক্সড করলে এটা ২৮ টাকা হয়। কিন্তু আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে গ্যাস দিচ্ছি ৫ টাকা করে।

জানা যায়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানির দিকে তাকিয়ে আছে সরকার। সেপ্টেম্বর থেকে পরিস্থিতি উন্নতির আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক এলাহি। তিনি বলেছেন, সেপ্টেম্বরে অনেকগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে। রামপালের ইউনিট চালু হবে, আদানি গ্রুপের একটি, এস আলম গ্রুপের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে। বড় পুকুরিয়া কয়লাখনিকে কেন্দ্র করে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, সেখানে উৎপাদন বাড়বে। ফলে সেপ্টেম্বরের পর দেশে হয়তো বিদ্যুতের সংকটটা থাকবে না। পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলেও সঞ্চালন লাইন সম্পূর্ণ না হওয়ায় কেন্দ্রটির অর্ধেক ক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বাগেরহাটে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার বিদ্যুৎকেন্দ্রও প্রায় নির্মাণ শেষের পথে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি গ্রুপের ১৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকার ২৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে। বড়পুকুরিয়ায় কয়লা স্বল্পতার কারণে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি ইউনিট থেকে আসছে অর্ধেক বিদ্যুৎ। চট্টগ্রামে ১২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রটিও এ বছরের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বরিশালে ৩০৭ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শেষের পথে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে সেটিও উৎপাদনে আসার কথা।

নসরুল হামিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, দুই/তিনমাস পরেই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আসতে থাকবে। রামপাল আসলে, পায়রার পুরোটা সিস্টেমে আসলে, আদানিরটা নভেম্বরে আসলে আমার মনে হয় অলটারনেটিভ ফুয়েলে চলে গেলাম। তখন গ্যাসের ওপর ভরসা করতে হবে না।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads